বিসর্জন
বুড়িগঙ্গার জল সেদিন অদ্ভুত রকম শান্ত ছিল।
পুরান ঢাকার সেই পুরনো ঘাটে, যেখানে বিকেলের আলো পানিতে পড়লে মনে হয় কেউ যেন গলিত সোনা ঢেলে দিয়েছে , সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল রানা নামে এক টকবকে যুবক। হাতে একটা ভাঁজ করা চিঠি। কিন্তু পাঠাবে না। পাঠানোর আর কোনো মানে নেই।
তিন বছর।
তিন বছর ধরে সে মেহেরকে ভালোবেসেছে। না, "ভালোবাসা" শব্দটা হয়তো যথেষ্ট না। সে মেহেরকে নিয়ে বেঁচে থেকেছে। প্রতিটা সকাল মেহেরের কথা ভেবে শুরু হতো, প্রতিটা রাত তার কণ্ঠস্বর মনে করে শেষ হতো। ঢাকার এই অলিগলি, মিটফোর্ড রোডের ব্যস্ততা, লালবাগের কেল্লার নীরবতা, বাহাদুর শাহ পার্কের পুরনো গাছগুলো - সবকিছুর সাথে মেহেরের স্মৃতি মিশে আছে।
প্রথম দিন দেখেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে, টিএসসির সামনে।
মেহের তখন রিকশা থেকে নামছে, হাতে বইয়ের স্তূপ, মাথায় অক্টোবরের রোদ। দুপুরের ঢাকায় সেই মুহূর্তটা আরিয়ানের মনে আজও ছবির মতো আটকে আছে । সাদা কুর্তির নিচে নীল সালোয়ার, কানে ছোট্ট রুপার দুল, আর ঠোঁটের কোণে একটা একচিলতে হাসি যেটা সে নিজের জন্য হাসছিল, কারো জন্য না।
রানা প্রথমবার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিল সেদিন।
পরিচয় হলো এক সপ্তাহ পরে, কমন রুমে। বইয়ের বিনিময়ে। মেহের হুমায়ূন আহমেদ পড়ত, রানা রবীন্দ্রনাথ। দুজনের ভেতর বিতর্ক শুরু হলো - হুমায়ূনের গল্পে মানুষ বেশি, না রবীন্দ্রনাথের কবিতায়? সেই বিতর্ক শেষ হয়নি কখনো। বরং সেই শেষ না-হওয়াটাই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে গেল।
তারপর - চা, বৃষ্টি, গল্প, চা, আবার বৃষ্টি।
ঢাকায় বৃষ্টি হলে কী সুন্দর যে লাগে! পুরান ঢাকার গলিতে জমা পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেহের বলত, "রানা, এই শহরটা না থাকলে আমি বাঁচতাম না।"
রানা মনে মনে বলত, তুমি না থাকলে আমিও না।
কিন্তু ভালোবাসার গল্পে শুধু বৃষ্টি থাকে না।
শীত আসে। শীতের পর গ্রীষ্ম। আর গ্রীষ্মের রোদে অনেক সত্য বেরিয়ে পড়ে যেগুলো বৃষ্টির মেঘে লুকিয়ে ছিল।
মেহেরের বাবা ছিলেন রক্ষণশীল মানুষ। নোয়াখালীর মানুষ, পুরনো মূল্যবোধে বিশ্বাসী। মেয়ের বিয়ে হবে তাঁর পছন্দমতো ছেলের সাথে। রানা ঢাকার ছেলে, ভিন্ন জেলার, বাবা নেই , এই পরিচয়গুলো কোনো ছাড়পত্র পাওয়ার মত না।
মেহের একদিন ফোনে বলেছিল, "রানা, তুমি যদি একটু... আমি জানি না।"
"কী?"
"কিছু না।"
সেই "কিছু না"-র ভেতর রানা অনেক কিছু শুনতে পেয়েছিল।
তারপর থেকে দুজনের ভেতর একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হতে শুরু করল। কথা হতো, কিন্তু সেই কথায় আগের উষ্ণতা ছিল না। দেখা হতো, কিন্তু চোখে আর সেই অকারণ আনন্দ থাকত না।
মেহের কেমন যেন বদলে গেল। না, বদলায়নি আসলে সে ভয় পেতে শিখে গেল।
শেষ দিনটা ছিল ফেব্রুয়ারিতে। একুশে ফেব্রুয়ারি।
প্রভাতফেরিতে ভোরবেলা দুজনে একসাথে গিয়েছিল শহীদ মিনারে। খালি পায়ে। হাতে হলুদ-লাল ফুল। চারদিকে মানুষের ভিড়, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো" গানের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। এই দিনে ঢাকা অন্যরকম হয়ে যায় । শহরটা যেন নিজেই একটা কাব্য হয়ে ওঠে।
মেহের ফুল রাখার পর রানার দিকে তাকাল।
সেই চাহনিতে রানা সব বুঝে গেল।
"মেহের—"
"রানা, আমাকে কিছু বলতে দাও।"
"আমি জানি তুমি কী বলবে।"
"তাহলে তুমিই বলো।"
রানা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। চারপাশে মানুষ, গান, ফুলের গন্ধ। আর ভেতরে ভেতরে একটা পৃথিবী ভেঙে পড়ছে।
"তোমার বাবা রাজি না।"
"না।"
"তুমি চাইলে লড়াই করতে পারতে।"
মেহেরের চোখ ভিজে এলো। "রানা, তুমি কি জানো, প্রতিদিন রাতে আমি বালিশে মুখ গুঁজে ভাবি। নিজেকে বোঝাই। কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকালে... আমি পারি না।"
"তুমি তাকে ভালোবাসো।"
"হ্যাঁ।"
"আমাকেও।"
"হ্যাঁ।" কণ্ঠ ভেঙে গেল। "কিন্তু এই দুটো ভালোবাসা এক জায়গায় থাকতে পারছে না।"
রানা বুঝল, মেহের মিথ্যে বলছে না। সে পালিয়ে যাচ্ছে না। সে আসলে একটা অসম্ভব জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যেদিকেই যাক, কাউকে না কাউকে হারাতে হবে।
সেদিন রানা মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ঠিক আছে।"
মাত্র দুটো শব্দ। কিন্তু সেই দুটো শব্দ বলতে গিয়ে তার মনে হলো সমুদ্রের তলায় ডুব দিয়ে বলছে।
মেহের চলে গেল।
ভিড়ের মধ্যে সে মিলিয়ে গেল — সাদা শাড়িতে, হাতে বেলি ফুল, চোখে জল চাপা দিয়ে। আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল শহীদ মিনারের সামনে। একা।
চারপাশে ভাষার উৎসব। আর সে ভুলে গেছে ভাষা।
সেদিনের পর থেকে রানার ঢাকা বদলে গেছে।
টিএসসির চা-দোকানে এখন একা বসে। সেই কমন রুমের সামনে দিয়ে হাঁটার সময় পা দ্রুত করে ফেলে। মিটফোর্ডের গলিতে কোনো সাদা কুর্তি দেখলে বুক ধড়াস করে ওঠে । তারপর দেখে, না, সে মেহের না।
কিন্তু সবচেয়ে কঠিন লাগে বৃষ্টিতে।
ঢাকায় বৃষ্টি হলে রানা এখন জানালা বন্ধ করে দেয়। কারণ বৃষ্টির শব্দে মেহেরের হাসি শোনা যায়।
বুড়িগঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যা নামছে।
রানা হাতের চিঠিটার দিকে তাকাল। সে এই চিঠি লিখেছিল তিন রাত জেগে। সব কথা আছে , অভিমান, ভালোবাসা, রাগ, ক্ষমা। কিন্তু পাঠাবে না।
কারণ মেহেরকে সে সত্যিই ভালোবেসেছিল। আর সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয় না।
সে চিঠিটা ধীরে ধীরে ভাঁজ করল। আরও ভাঁজ করল। তারপর আস্তে করে বুড়িগঙ্গার জলে ছেড়ে দিল।
কাগজটা একটু ভাসল। তারপর ধীরে ধীরে ডুবে গেল।
রানা অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল।
বুড়িগঙ্গার বাতাসে পচা জলের গন্ধ, নৌকার কাঠের গন্ধ, আর দূরে কোথাও ভাপা পিঠার গন্ধ মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুবাস।
এই শহর। এই তার শহর। মেহের চলে গেছে, কিন্তু ঢাকা যায়নি।
কয়েক মাস পরে, একদিন হঠাৎ ফোন।
অপরিচিত নম্বর। ধরতে গিয়ে হাত থামল। তারপর ধরল।
"রানা।"
মেহেরের গলা।
আরিয়ান কিছু বলতে পারল না।
"কেমন আছো?"
"ভালো।" মিথ্যে।
"আমি... আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।" কণ্ঠ কাঁপছে। "জানাতে চাইলাম।"
"ধন্যবাদ জানানোর জন্য।" সত্যি কথা।
"রানা, আমি—"
"মেহের।" রানা থামাল। "তুমি ভালো থেকো। সত্যি বলছি।"
লম্বা নীরবতা।
"তোমাকে ভুলতে পারব না।" মেহের ফিসফিস করে বলল।
"আমিও না।" রানা বলল। "কিন্তু ভুলতে না পারলেও বেঁচে থাকা যায়। এটা আমি শিখে গেছি।"
ফোন কেটে গেল।
রানা ছাদে উঠল।
পুরান ঢাকার ছাদ থেকে রাতের শহর দেখা যায় । লালবাগের মিনার, বুড়িগঙ্গার কালো জলে আলোর প্রতিফলন, দূরে চকবাজারের হইচই, ওপরে অসংখ্য তারা।
এই শহরে কতো গল্প আছে। কতো ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে, কতো মরে গেছে। কতো মানুষ এই ছাদে দাঁড়িয়ে কেঁদেছে, কতো মানুষ হেসেছে।
রানা ভাবল, ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলে মানুষ কি ভেঙে পড়ে? হয়তো। কিন্তু ভেঙে পড়াটাই শেষ না। ভেঙে যাওয়ার পরেও ভোর হয়। ঢাকায় ভোর হয়। বুড়িগঙ্গায় সকালের আলো পড়ে। রিকশার ঘণ্টি বাজে। চায়ের দোকান খোলে।
জীবন থামে না।
অনেক দিন পরের কথা।
রানা একদিন টিএসসির সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে বই। পাশ থেকে কেউ বলল, "এক্সকিউজ মি, এই বইটা কি হুমায়ূন আহমেদের?"
ঘুরে তাকাল।
একটা মেয়ে। হাতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই।
রানা একটু হাসল। "হ্যাঁ। আর আপনার হাতেরটা?"
"রবীন্দ্রনাথ।"
"হুমায়ূন ভালো, না রবীন্দ্রনাথ?"
মেয়েটা একটু অবাক হলো। তারপর হাসল। "বিতর্কের ব্যাপার।"
"বিতর্ক করব?"
সে হাসল। "চা খেতে খেতে।"
রানা আকাশের দিকে একবার তাকাল।
মেহেরের কথা মনে পড়ল- সেই বৃষ্টি, সেই বুড়িগঙ্গার ঘাট, সেই চিঠি যেটা ডুবে গেছে।
কিন্তু সেই মনে পড়াটা এখন আর ক্ষত না। এটা একটা দাগ - যেটা থাকবে, কিন্তু আর রক্ত ঝরাবে না।
"চলুন।" সে বলল।
বুড়িগঙ্গা বয়েই চলে।
কতো কান্না গেছে এই জলে, কতো ভালোবাসা গেছে । নদী মনে রাখে না। সে শুধু বয়। যেদিকে মোহনা, সেদিকে।
মানুষও তাই।
বিচ্ছেদ একটা অধ্যায়। আর জীবন, জীবন একটা পুরো বই। একটা অধ্যায় শেষ হলে পরের পাতা উল্টাতে হয়।
শেষ