শুনতে অবাক লাগলেও পৃথিবীর এমন কয়েকটি দেশ রয়েছে, যেখান থেকে চাঁদ পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় কিছুটা কাছাকাছি বলে মনে হয়। কিন্তু এটি কোনো অপটিক্যাল ইলিউশন নয়; আসলেই এমন ভৌগোলিক কারণ রয়েছে যার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটে। 

প্রথমেই যে দেশটির নাম আসে সেই দেশটির নাম ইকুয়েডর। এখানে রয়েছে  চিম্বোরাজো পর্বত, এটি হলো সেই স্থান, যেখান থেকে চাঁদকে সবচেয়ে কাছাকাছি দেখা যায়। পৃথিবী আসলে পুরোপুরি গোল নয়; এটি কিছুটা চ্যাপ্টা, বা "ওবলেট স্ফেরয়েড" আকৃতির, যার কারণে নিরক্ষীয় অঞ্চলের স্থানগুলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করে। আর এ কারনেই চিম্বোরাজো পর্বতের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬২৬৩ মিটার হলেও এটি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬৩৮৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে প্রায় ২ কিলোমিটার বেশি। এই কারণে, ইকুয়েডরের চিম্বোরাজো পর্বত থেকে চাঁদ পৃথিবীর যেকোনো স্থানের তুলনায় কিছুটা কাছাকাছি মনে হয়।  

তবে, চিম্বোরাজো একমাত্র স্থান নয় যেখানে চাঁদকে অনেক কাছাকাছি মনে হয়। এছাড়া, নেপালের মাউন্ট এভারেস্ট এবং পেরুর হুয়াসকারান পর্বতেও  এই একই ধরনের ঘটনা ঘটে। যদিও ভূ-কেন্দ্র থেকে মাউন্ট এভারেস্ট চিম্বোরাজোর চেয়ে কিছুটা কম দূরে, তবে এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হওয়ায় এর চূড়া থেকে চাঁদকে বিশাল ও অসাধারণ সুন্দর দেখতে পাওয়া যায়। মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৮৮৪৮ মিটার, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকে বেশি উঁচু। অপর দিকে পেরুর হুয়াসকারান আন্ডিস পর্বতমালার অন্যতম উঁচু পর্বত, যার উচ্চতা প্রায় ৬৭৬৮ মিটার। এই পর্বতটি পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলের একটু বাইরে অবস্থান করলেও এর উচ্চতা এবং ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এখান থেকেও চাঁদকে কিছুটা বড় দেখায়। 

কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন আসে—চাঁদকে এত কাছাকাছি দেখতে পাওয়ার পরেও, কেন এই স্থানগুলো মহাকাশ অভিযানের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পরিণত হয়নি? বিশেষ করে যখন ইলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তারা চাঁদ ও মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তখন কেন তারা এই দেশগুলোকে বিবেচনা করছেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের মহাকাশ অভিযানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বুঝতে হবে। চাঁদে পৌঁছানোর জন্য উৎক্ষেপণের জন্য কয়েকটি বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে যা এই দেশগুলো মেটাতে পারে না। আসুন দেখে নিই সেই কারণগুলো কী কী ? 

লঞ্চ প্যাডের অবকাঠামো ও স্থিতিশীলতাঃ রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো, বড় ও স্থিতিশীল স্থান প্রয়োজন। ইকুয়েডরের চিম্বোরাজো, নেপালের এভারেস্ট, এবং পেরুর হুয়াসকারান—এই পর্বতগুলো উচ্চতার দিক থেকে চাঁদের কাছাকাছি মনে হলেও এগুলো যথেষ্ট স্থিতিশীল নয়।  এছাড়া উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে এসব অঞ্চলে রকেট উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় বড় ও শক্তিশালী লঞ্চ প্যাড তৈরি করতে হবে, যা পর্বতের খাড়া ঢালে প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই, নাসা এবং স্পেসএক্সের মতো সংস্থা নিরাপদ ও স্থিতিশীল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ব্যবহার করে, যেমন ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল বা কাজাখস্তানের বাইকোনুর কসমোড্রোম।

অক্সিজেন ও উচ্চতা সম্পর্কিত সমস্যাগুলোঃ উচ্চতা যত বেশি হবে, বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব তত কমে যাবে। উচ্চ উচ্চতায় বায়ুর ঘনত্ব কম থাকায় সেখানে অত্যন্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি পরিচালনা করা কঠিন। চিম্বোরাজো, এভারেস্ট, এবং হুয়াসকারানের মতো উচ্চ শৃঙ্গগুলোতে অক্সিজেনের অভাবে মানবশরীরের পাশাপাশি প্রযুক্তিরও কর্মক্ষমতা অনেক কমে যায়। একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র পরিচালনা করতে প্রচুর পরিমাণ শক্তি ও জ্বালানি প্রয়োজন, যা এই উচ্চ উচ্চতায় কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। তাই, সমতল ভূমিতে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করাই সবচেয়ে উপযুক্ত। 

খরচ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাঃ ইলন মাস্কের স্পেসএক্স বা নাসার মতো সংস্থাগুলো রকেট উৎক্ষেপণ ও মহাকাশ মিশনের জন্য তাদের নির্দিষ্ট বাজেট এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে কাজ করে। এমন কোনো পর্বতের শৃঙ্গে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র স্থাপন করতে গেলে, এটি অতিরিক্ত অর্থ এবং সম্পদের প্রয়োজন হবে। চিম্বোরাজো, এভারেস্ট বা হুয়াসকারান যেহেতু দুর্গম ও ব্যয়বহুল স্থান, তাই এই ধরনের পর্বতকে মহাকাশ মিশনের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা খুবই ব্যয়বহুল এবং অনেকক্ষেত্রে অবাস্তব।

আবহাওয়া ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতাঃ এই উচ্চ পর্বতগুলোতে আবহাওয়ার পরিবর্তন খুব দ্রুত হয়, যা উৎক্ষেপণের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। বিশেষ করে চিম্বোরাজো এবং এভারেস্টে তীব্র বাতাস, তুষারঝড় এবং নিম্ন তাপমাত্রার কারণে সেখানে উৎক্ষেপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। স্পেস মিশনের সময় এই ধরনের পরিবেশ থাকলে তা মিশনের সাফল্যকে বিপদে ফেলতে পারে। 

এক গভেষনায় জানা গেছে,  ইলন মাস্ক তার উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে সমুদ্রপৃষ্ঠে রাখতে চান তার কারণ হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উৎক্ষেপণ করলে মহাকর্ষের টান কমাতে রকেটকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয় না। এছাড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উৎক্ষেপণ করলে রকেটের গতি অর্জন করা এবং সঠিক কক্ষপথে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। মহাকাশে যেতে হলে রকেটকে সুনির্দিষ্ট "এসকেপ ভেলোসিটি" বা পালানোর গতি অর্জন করতে হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি থেকে উৎক্ষেপণ করলে, এই গতি অর্জনের জন্য কম শক্তি প্রয়োজন হয় এবং এটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই ইলন মাস্ক তার রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি রাখতে পছন্দ করেন।

বর্তমানে চাঁদ বা মঙ্গলে যাওয়ার জন্য ইলন মাস্কের স্পেসএক্স বা নাসার মতো সংস্থাগুলো এই উচ্চতায় অবস্থিত দেশগুলোতে উৎক্ষেপণ কেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবছে না। তবে ভবিষ্যতে যদি মহাকাশ ভ্রমণের প্রযুক্তি আরও উন্নত হয় এবং উচ্চ উচ্চতায় রকেট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়, তখন ইকুয়েডর, নেপাল বা পেরু এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। অবশ্যই তখনও এই অঞ্চলে অবকাঠামো এবং খরচের চ্যালেঞ্জগুলো থাকবে, তবে ভবিষ্যতের উন্নত প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে হয়তো তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।

 ওকেআর / বাংলা সংযোগ