সকালে ঘুম থেকে উঠেই মুঠোফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের রঙিন দুনিয়ায় নিখুঁত জীবনের হাতছানি। কিন্তু স্ক্রল করতে করতেই হঠাৎ বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে-এই যে প্রতিদিনের চেনা ইঁদুরদৌড়, সকাল-সন্ধ্যা ছুটে চলা, এত আয়োজন; সবকিছুর শেষ কোথায়? মহাবিশ্বের এই কোটি কোটি গ্যালাক্সির ভিড়ে আমাদের এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বের কি সত্যিই কোনো মানে আছে? নাকি আমরা কেবল এক অনন্ত অর্থহীনতার ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির এই যুগে মানুষের বাহ্যিক জীবন যাপন যতটা সহজ হয়েছে, ভেতরের শূন্যতাবোধ ততটাই প্রকট হয়ে উঠেছে। মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আজকের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ নীরবে ভুগছে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে, দর্শনের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘নিহিলিজম’ বা ‘শূন্যবাদ’। ঊনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় দার্শনিকদের হাত ধরে যে চিন্তার বীজ রোপণ করা হয়েছিল, একবিংশ শতাব্দীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এসে তা যেন ঢাকার রাজপথেও নতুন করে ডালপালা মেলছে।

 ‘নিহিলিজম’ শব্দটির অর্থ এই নয় যে পৃথিবীতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। বরং এর আসল তাৎপর্য হলো-জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত বা স্বর্গীয় উদ্দেশ্য নেই।

হাজার বছর ধরে মানুষ ধর্ম, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের একটি অর্থ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু উনিশ শতক থেকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সেই পুরোনো বিশ্বাসের দেয়ালে প্রথম আঘাত হানে। চার্লস ডারউইন যখন দেখালেন মানুষ কোনো অলৌকিক সৃষ্টি নয়, বরং বিবর্তনের ফল; কিংবা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন প্রমাণ করলেন মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পৃথিবীর কোনো বিশেষ স্থান নেই-তখন মানুষের এতদিনের চেনা পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যায়।

ফ্রেডরিখ নিটশে (Friedrich Nietzsche) ১৮ শতকের শেষভাগে এসে উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর সেই যুগান্তকারী ও বহুল বিতর্কিত বাক্য-“God is dead” (ঈশ্বর মৃত)। নিটশে মূলত বলতে চেয়েছিলেন, আধুনিক সমাজব্যবস্থায় মানুষের মন থেকে ঈশ্বরের কেন্দ্রীয় অবস্থানটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই শূন্যতা ঢাকতে মানুষ বিজ্ঞান বা বস্তুবাদের নতুন যে ভিত্তি তৈরি করেছে, তা মানুষের ভেতরের নৈতিক সংকট বা একাকীত্ব দূর করতে পারছে না। আজকের দিনে প্রতিনিয়ত হাজারো তথ্যের ভিড়ে মানুষের যোগাযোগ বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে।

নিহিলিজমের এই চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, তা নিয়ে দুই মহান দার্শনিকের দ্বন্দ্ব আজও প্রাসঙ্গিক। চরম নৈরাশ্যবাদী জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার (Arthur Schopenhauer) মনে করতেন, মানুষের জীবন মূলত কষ্টের এক দোলাচল। তিনি দেখান, আমাদের জীবন ‘উইল’ বা বেঁচে থাকার এক অন্ধ শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষ যখন কোনো লক্ষ্য অর্জন করে, তখন সাময়িক আরাম পেলেও খুব দ্রুতই সেখানে জাঁকিয়ে বসে ‘একঘেয়েমি’। এরপর মানুষ আবার নতুন কোনো লক্ষ্যের পেছনে ছুটে চলে। অর্থাৎ, মানুষের জীবন কষ্ট এবং একঘেয়েমির মাঝামাঝি দুলতে থাকা এক পেন্ডুলাম মাত্র। শোপেনহাওয়ারের মতে, এই অন্ধ ইচ্ছা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।

তবে শোপেনহাওয়ারের এই চরম হতাশাকে মেনে নেননি তাঁর উত্তরসূরি ফ্রেডরিখ নিটশে। নিটশে বলেন, জীবন যদি সত্যিই কষ্টে ভরা হয়, তবে তার সমাধান জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং জীবনকে আরও গভীরভাবে আলিঙ্গন করা। তিনি তত্ত্ব দেন ‘আমোর ফাতি’ (Amor Fati) বা নিজের নিয়তিকে ভালোবাসার।

নিটশের মতে, জীবনের ব্যর্থতা, অপমান, দুঃখ বা প্রিয় মানুষের হারিয়ে যাওয়া-সবকিছুকেই নিজের আত্মিক বিকাশের অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে। একটি পাথর যেমন ছেনির প্রতিটি আঘাত সহ্য করে তবেই সুন্দর ভাস্কর্যে পরিণত হয়, মানুষের ব্যক্তিত্বও তেমনি জীবনের প্রতিটি আঘাতের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়।

আজকের তরুণ প্রজন্মের মানসিক অবস্থাকে নিটশের দুটি ধারণার আলোকেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব: ‘প্যাসিভ নিহিলিজম’ (নিষ্ক্রিয় শূন্যবাদ) এবং ‘অ্যাক্টিভ নিহিলিজম’ (সক্রিয় শূন্যবাদ)।

আজকের দিনের যে তরুণ মনে করেন, “যেহেতু জীবনের কোনো অর্থ নেই, তাই পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়ে কোনো লাভ নেই”-তিনি মূলত প্যাসিভ নিহিলিজমের শিকার। এই মানসিকতা মানুষকে জীবনের প্রতি উদাসীন করে তোলে, নিজের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে এবং মানুষকে ঠেলে দেয় বিষণ্নতার অতল গহ্বরে।

অন্যদিকে, অ্যাক্টিভ নিহিলিজমের পথটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সক্রিয় শূন্যবাদী ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, “মহাবিশ্ব যেহেতু আমাকে কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য দেয়নি, তার মানে নিজের জীবনের অর্থ তৈরি করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও দায়িত্ব এখন আমার নিজের।” এই মানুষটি ব্যর্থতাকে ভয় পান না, বরং শূন্য ক্যানভাসে নিজের মতো করে জীবনের ছবি আঁকেন। নিটশে একেই বলতেন ‘উবারমেনশ’ (Ubermensch) বা অতিমানব-যিনি নিজের গড়া মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে সমাজ বা অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজেই নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করেন।

পরবর্তী সময়ে আলবেয়ার কামু (Albert Camus) এবং কার্ল ইয়ুং (Carl Jung)-এর মতো চিন্তাবিদেরা মানুষের অস্তিত্বের এই লড়াইকে আরও সংজ্ঞায়িত করেছেন। কামুর মতে, জীবন চূড়ান্তভাবে অর্থহীন ও অবাস্তব জেনেও প্রতিদিন মর্যাদা ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার মাঝেই মানুষের আসল সৌন্দর্য। অপরদিকে কার্ল ইয়ুং দেখিয়েছেন, নিজের ভেতরের ‘শ্যাডো’ বা অন্ধকার দিকগুলোকে স্বীকার না করলে ভেতরের আলো কখনো সম্পূর্ণ হয় না।

আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির সাহায্যে জীবনের বাহ্যিক চাকচিক্য হয়তো সহজেই অর্জন করতে পারছে, কিন্তু ভেতরের শূন্যতার সঙ্গে লড়াইয়ে অনেক সময়ই তারা হেরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনের অর্থ কোনো বইয়ের শেষ পাতায় বা অন্যের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা থাকে না। প্রতিদিনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের জীবনের অর্থ নিজেই সৃষ্টি করে।

মহাবিশ্বের কাছে হয়তো আমাদের প্রতিটি স্পন্দন অতি ক্ষুদ্র এক ঘটনা মাত্র, কিন্তু নিজের তৈরি মূল্যবোধের সাহসে ভর করে মানুষ নিজেই নিজের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক অনন্য বিস্ময়। আর সেই ভেতরের মানুষের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হওয়াই সম্ভবত মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা।

লামিন ইয়ামাল / বাংলা সংযোগ