ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় নবনির্মিত রাম মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া দান এবং প্রণামীর কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ট্রাস্টের তহবিল থেকে ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান গয়না তছরুপের এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাধারণ ভক্তদের মাঝে গভীর অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ঘটনার নৈতিক দায় স্বীকার করে ইতিমধ্যে ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং অন্যতম ট্রাস্টি অনিল মিশ্র তাঁদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া মন্দিরটির দান তছরুপের ঘটনায় গঠিত বিশেষ তদন্ত দলের (এসআইটি) প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।


রাম মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের খবর সামনে আসার পর অনেক ধর্মপ্রাণ ভক্তই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা ও রাম ভক্ত প্রাচী খারে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, ‘আমি ভগবান রামের ভক্ত, কিন্তু মন্দিরে আর কোনো দান করব না। আমার বাবা ও ঠাকুরদার স্বপ্ন ছিল অযোধ্যায় রামের মন্দির হোক। সেই স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে। এখন রামলালার প্রতি আমার ভক্তি আমি অন্য কোনোভাবে প্রকাশ করব।’


একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে রামগোপাল গোয়েল নামের আরেক ভক্ত বলেন, ‘ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ভক্তদের দেওয়া দান কিছু অসাধু লোক পকেটে ভরছে। আমাদের ধর্মীয় আবেগের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই।’


রাম মন্দিরের দান তছরুপের ঘটনাটি প্রথম জনসমক্ষে আনেন মহিপাল সিং নামের এক ব্যক্তি, যিনি আগে এই ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের তদারকি করতেন। তাঁকে এই ঘটনার ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা তথ্য ফাঁসকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মহিপাল সিংয়ের দাবি, ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান ধাতুর ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ধরা পড়ার পর তিনি যখন ট্রাস্টের ভেতরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তখনই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি তিনি গণমাধ্যমে কথা বললে প্রাণনাশের হুমকিও পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।


পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং অযোধ্যার সংসদ সদস্য অবধেশ প্রসাদ এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে তদন্তের দাবি জানান। দলটির সাবেক বিধায়ক পবন পান্ডের অভিযোগ, ভক্তদের দেওয়া অনুদান থেকে অন্তত ৭ কোটি থেকে সাড়ে ৭ কোটি রুপির সম্পত্তি তছরুপ বা নয়ছয় করা হয়েছে।


বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করার পর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করা হয়। রাজ্য সরকারের অর্থ বিভাগের বিশেষ সচিব নীলরত্ন কুমার ও বিজয় বিশ্বাস পন্থের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি প্রাথমিক তদন্তের পর রাম জন্মভূমি থানায় একটি এজাহার (এফআইআর) দায়ের করে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) কর্মচারী কর্তৃক চুরি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় মামলাটি করা হয়।


অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ইতিমধ্যেই আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-টিন্নু যাদব, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, মনীশ যাদব, সুভাষ শ্রীবাস্তব, করুণেশ পান্ডে ও রামশঙ্কর মিশ্র। এরা সবাই মন্দির প্রাঙ্গণের তীর্থযাত্রী সুবিধা কেন্দ্রে থাকা ৪০টি দানপাত্রের অর্থ গণনার দায়িত্বে ছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া টিন্নু যাদব এই চুরির অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী বলে ধারণা করছে পুলিশ।


এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় কড়া অবস্থান নিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘জনগণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে এমন ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যে বা যারাই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা এসআইটি গঠন করেছি এবং শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব।’


এদিকে ঘটনার তীব্রতায় অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনি লড়াই লড়বেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অযোধ্যার বার অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইকে তিন দিনের মধ্যে অযোধ্যা ছাড়ারও আলটিমেটাম দিয়েছে আইনজীবীদের এই সংগঠনটি।


২০২৪ সালের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অযোধ্যার ঐতিহাসিক স্থানে রাম মন্দিরের উদ্বোধন করেন। হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মন্দিরটিতে সংগৃহীত দানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩০ কোটি ভারতীয় রুপি। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভক্তের আগমন ঘটে এই মন্দির চত্বরে। ফলে দেশটিতে এটি অন্যতম ধনী মন্দিরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এত কম সময়ের মধ্যে ভক্তদের বিশ্বাসের জায়গায় এমন বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় পুরো মন্দির ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সূত্র- বিবিসি