পরীক্ষা শুরু হয়েছে মাত্র। খাতার ওপর ঝুঁকে পড়েছে শরীর। একদিকে হাত দিয়ে কলম চলছে, অন্যদিকে অনবরত কাঁপছে শরীর। কথা বলতে গেলে জিভ জড়িয়ে যায়, মুখ শুকিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। কিন্তু চোখের কোণে লেগে থাকা অদম্য স্বপ্ন আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে সব শারীরিক কষ্ট। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে এভাবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন কুড়িগ্রামের মেয়ে কুমারী অনামিকা রায়। তাঁর স্বপ্ন—পড়াশোনা শেষ করে তিনি এক দিন শিক্ষক হবেন।

অনামিকা রায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর কলেজের ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস (বিএম) শাখার শিক্ষার্থী। চলতি বছর তিনি উপজেলার বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে (ভেন্যু: রাবাইতাড়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ) এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। তাঁর রোল নম্বর ৪৯৬৭৪২। এর আগে ২০২৪ সালে গাগলা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-২.৭২ পেয়ে সাফল্যের সঙ্গে এসএসসি পাস করেছিলেন তিনি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জন্মের প্রথম পাঁচ বছর আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই সুস্থ ছিলেন অনামিকা। কিন্তু এরপর হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর দুই পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ বেঁকে যায়। সেই থেকে কোনোমতে হেলেদুলে কষ্ট করে চলাচল করতে হয় তাঁকে। কথা বলতে গেলেও তীব্র কষ্ট হয়; জিভ বের হয়ে আসে, ঠোঁট ও তালু জড়িয়ে যায়। অনামিকার একটি ছোট ভাইও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী।

অনামিকা শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার নন, তাঁর পরিবারও দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে জর্জরিত। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা ইউনিয়নের ব্যাঙের দোলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক শ্রী অনিল চন্দ্র ও কাঞ্চনমালা দম্পতির চার মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে অনামিকা সবার ছোট। মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে বাবা অনিল চন্দ্র প্রায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন ঘরভিটাসহ মাত্র ২৪ শতক জমিই তাঁদের একমাত্র সম্বল। পরিবারের খরচ চালাতে অনিলের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তাই বাড়তি কাজ করতে হয় তাঁকে। চরম এই অভাবের মধ্যেও অনামিকার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও লড়াই দেখে মুগ্ধ এলাকাবাসী।

পরীক্ষাকেন্দ্রে জড়ানো গলায় অনামিকা রায় বলে, "পড়াশোনা করে আমি শিক্ষক হতে চাই। সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেলে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব।"

অনামিকার এই অদম্য যাত্রাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তাঁর শিক্ষকেরাও। কাশিপুর কলেজের প্রভাষক আবু সিদ্দিক বলেন, "অনামিকা আমাদের কলেজের বিএম শাখার একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী। পড়াশোনার একটু অনুকূল পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে সে তার লক্ষ্য পূরণে অবশ্যই সফল হবে।"

একই কলেজের প্রভাষক আব্দুল আলিম বলেন, "সে সব বাধা পেরিয়ে এসএসসি পাস করেছে। সব শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে সে জীবনে বড় ধরনের সাফল্য নিয়ে আসতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।"

পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব ও বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম বলেন, "কোনো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি নিয়মানুযায়ী আবেদন করে, তবে বোর্ডের নির্ধারিত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও বাড়তি সময় তাকে দেওয়া হবে।"

উপজেলা সূত্রে জানা গেছে, চলতি এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ, বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং শাহবাজার আবুল হোসেন সিনিয়র (কামিল) মাদ্রাসায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১,১০৫ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১,০৭৪ জন এবং ৩১ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।

অনামিকার মতো অদম্য প্রাণশক্তি ও ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সমাজের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না, অনামিকা যেন প্রতি মুহূর্তেই সেই প্রমাণ দিয়ে চলেছেন।