মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। এই স্থগিতাদেশের পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বড় একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তা হলো দীর্ঘদিনের বৈরী এই দুই দেশের মধ্যে কি আদৌ কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি সম্ভব?

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া কিছু সংঘাতের জেরে এই স্থগিতের সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ এই আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে সুইজারল্যান্ড বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এখনো সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি। এই অচলাবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত কেবল দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় হলো দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর অনাস্থা।

প্রথমত, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ইরান নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রধান উদ্বেগ হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন। এই মৌলিক জায়গাগুলোতে সমঝোতায় না পৌঁছে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং ইসরায়েলের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিরোধিতা উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে কোনো বড় চুক্তিতে যাওয়া বেশ কঠিন।

একইভাবে তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি সবসময় সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলে দুই দেশই সংকটের সমাধান চাইলেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।

সুইজারল্যান্ডের বৈঠক স্থগিত হওয়াকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সমাপ্তি হিসেবে দেখতে নারাজ অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা থমকে গেলেও পর্দার আড়ালে বা গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলে দুই দেশের যোগাযোগ অব্যাহত থাকতে পারে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির জন্য উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের কৌশলগত ছাড় দিতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তেমন কোনো বড় ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ওয়াশিংটন বা তেহরান, কারও মধ্যেই আপাতত স্পষ্ট নয়। ফলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিকট ভবিষ্যতে দূরহ এক লক্ষ্য হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলটি/বাংলা সংযোগ