দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকিং লেনদেন সহজ করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী মাসের (আগস্ট) মাঝামাঝি সময়ে এই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ধাপে রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ডুয়াল কারেন্সি (দ্বৈত মুদ্রা) ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে প্রবাসীদের।

আজ শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রবাসী কার্ড বিষয়ক সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিশেষ সামাজিক ও আর্থিক সুবিধা পাবেন। আগামী বছরের জুনের মধ্যে দুই লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৫০ হাজার প্রবাসীকে এই কার্ড দেওয়া হবে। আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে এই সংখ্যা ২ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে কার্ডের কাজ শুরু হলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী কার্ডের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ক্রীড়া কার্ডের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসী কার্ড চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। এই কার্ড চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এবং ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা।

কার্ডধারীরা যেসব সুবিধা পাবেন
প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে ও বিদেশে বহুমুখী সেবা ও অগ্রাধিকার পাবেন। উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

- বিমানবন্দর ও ভ্রমণ সুবিধা: দেশে-বিদেশে কমপ্লিমেন্টারি বিমানবন্দর লাউঞ্জ ব্যবহার ও বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুত সেবা। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কমপ্লিমেন্টারি ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সেবা। বিমানের টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ ছাড়। দেশে-বিদেশে সাশ্রয়ী মূল্যে গাড়ি বুকিং এবং সিগনেচার কার্ডধারীদের জন্য বিমানবন্দর পিক অ্যান্ড ড্রপ সুবিধা।

- চিকিৎসা ও বীমা সুবিধা: সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা বুথ এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় বিশেষ ছাড়। কোনো কার্ডধারীর প্রবাসে মৃত্যু হলে সরকারি খরচে দেশে লাশ পরিবহন, দেশে ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের সুযোগ ও বিশেষ বীমা সুবিধা।

- নাগরিক সেবা ও বিনিয়োগে অগ্রাধিকার: জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি (মিউটেশন), ইউটিলিটি সংযোগ, ব্যবসায়িক লাইসেন্স গ্রহণ ও বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন কার্ডধারীরা। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা অগ্রাধিকার পাবেন।

- আর্থিক ও রেমিট্যান্স সুবিধা: রেমিট্যান্স পাঠানোর বিপরীতে রিওয়ার্ড পয়েন্ট, উন্নত ক্রেডিট স্কোরিং ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা। কার্ডের মাধ্যমে বিদেশ থেকে সরাসরি টাকা পাঠানোসহ সহজে অন্যান্য ব্যাংকিং লেনদেনের সুবিধা।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত সব বাংলাদেশি প্রবাসী যেন পর্যায়ক্রমে এই কার্ডের আওতায় আসেন, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনএসডিএ) আরও সময়োপযোগী ও আধুনিক করার নির্দেশনা দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহাদী আমিন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব মোখতার আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এমএইচএস / বাংলা সংযোগ