দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন খুব শিগগিরই তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিতে পারেন। শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতিকে সরে দাঁড়ানোর জন্য ইতিমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই বার্তার পাশাপাশি তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হতে যাচ্ছেন, তা নিয়েও দলের নীতিনির্ধারণী মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

বঙ্গভবনের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতিমধ্যে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঙ্গভবন ছাড়ার ব্যাপারে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সূত্রটির ভাষ্যমতে, পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর তিনি কিছুদিন একান্তে বিশ্রামে থাকবেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর বিদেশে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

আলোচনায় সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন নামের অন্বেষণ শুরু হয়েছে। এর আগে এই শীর্ষ পদের জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানসহ বেশ কয়েকজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার নাম আলোচনায় ছিল। তবে বর্তমানে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত একজন সচিবের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার কারণে তাঁর নাম বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

অবশ্য এই আলোচনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত নই বা এ বিষয়ে অবগত নই। তবে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে একাধিক নাম আলোচনায় আসাটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।’

পদত্যাগ ও শূন্য পদ পূরণে সংবিধানে যা রয়েছে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্বহস্তে লিখিত ও স্বাক্ষরযুক্ত পত্র স্পিকারের উদ্দেশে পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।

সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ খালি হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত।

পটভূমি ও নানা বিতর্ক
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী ২০২৮ সালের এপ্রিলে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পটভূমি সম্পূর্ণ বদলে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বহাল ছিলেন। সে সময় ছাত্রনেতারা তাঁর অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করলেও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার কোনো চরম সিদ্ধান্ত নেয়নি। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে পুনরায় সামনে আসে।

এছাড়া, অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁর ভূমিকা এবং পরবর্তীতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন, তবে তা হবে গণ-অভ্যুত্থান ও নতুন সংসদ গঠনের পর দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি বড় পরিবর্তন। পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।