বিজ্ঞাপন
জাতীয়

বর্ষার বন্দনা ও আর্তের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস: চারুকলায় ‘ঘনঘটা ২’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

Published :
বর্ষার বন্দনা ও আর্তের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস: চারুকলায় ‘ঘনঘটা ২’

ইট-পাথরের নগরে বর্ষা মানেই যেন কর্দমাক্ত পথ, জলাবদ্ধতা আর অন্তহীন যানজটের ভোগান্তি। তবে নাগরিক জীবনের এই একঘেয়েমি ও যন্ত্রণার আড়ালে বর্ষার যে এক চিরন্তন সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক রূপ রয়েছে, তাকেই নাচ আর সুরের আবহে তুলে ধরা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। সেখানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা ২’। তবে এই আয়োজন কেবল বর্ষা বন্দনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা।

একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদের উদ্যোগে এবং চারুকলা অনুষদের সার্বিক সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতির চর্চাকে সমাজের বিপন্ন মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করাই ছিল এই আয়োজনের মূল সুর।

আয়োজন প্রসঙ্গে অর্থি আহমেদ জানান, প্রায় চার মাস আগে থেকেই তাঁরা এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পার্বত্য এলাকায় যে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা আয়োজকদের ভাবিয়ে তোলে। তাঁরা মনে করেছেন, এমন বড় দুর্যোগকে উপেক্ষা করে শুধু উৎসব করা যায় না। শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তাঁরা বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাকবলিত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহের এই উদ্যোগ নিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ‘অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমি’র সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে বন্যার্তদের জন্য অনুদান দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আসা সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ভেন্যুতেই দুটি বিশেষ বুথ স্থাপন করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জাগো ফাউন্ডেশন’। এই বুথগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত সব অর্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় সাহায্যার্থে পাঠানো হবে।

তহবিলের পরিমাণ নিয়ে অর্থি আহমেদ বলেন, "হয়তো আমাদের সংগৃহীত তহবিলের পরিমাণ খুব বেশি হবে না। কিন্তু সংকটের এই সময়ে শিল্পীরা তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। আমরা কতটুকু সাহায্য করতে পারব, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন; তবে এই সংকটে উদাসীন থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।"

প্রায় ৯০ মিনিটের এই বিশেষ আয়োজনে পরিবেশিত হয় মোট ১৬টি ভিন্ন ঘরানার নৃত্য। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গান ও সুরের ওপর ভিত্তি করে এই নৃত্যগুলো সাজানো হয়েছিল।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল এতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের বৈচিত্র্য। তিন বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে সত্তর বছর বয়সী প্রবীণ—সব মিলিয়ে তিন শতাধিক শিল্পী এই পরিবেশনায় অংশ নেন। তাঁদের অনেকেই প্রথমবারের মতো মঞ্চে পারফর্ম করেছেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শুধু পেশাদার নৃত্যশিল্পীই ছিলেন না, বরং ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও গৃহিণীসহ নানা পেশার সাধারণ মানুষ, যাঁদের একক সুতোয় বেঁধেছিল নাচের প্রতি ভালোবাসা।

উদ্যোক্তাদের মতে, নাগরিক জীবনে বর্ষা এখন কেবলই ভোগান্তির প্রতীক হয়ে উঠছে। অথচ বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বর্ষা চিরকালই উৎসব ও উদযাপনের অংশ। সেই হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক চেতনাকে পুনরায় মানুষের সামনে নিয়ে আসতেই এই ‘ঘনঘটা ২’-এর আয়োজন।

উল্লেখ্য, একুশে পদক পাওয়ার পর এটিই অর্থি আহমেদের একাডেমির প্রথম বড় মাপের আয়োজন। গত বছর অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম ‘ঘনঘটা’ অনুষ্ঠানের সাফল্যের ধারাবাহিকতা এবং দর্শক-শ্রোতাদের ইতিবাচক সাড়াই এবার আরও বড় পরিসরে এই উৎসব আয়োজনে মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই উন্মুক্ত নৃত্যানুষ্ঠানে বৃষ্টির আবহ ও নাচের মুদ্রায় মেতেছিলেন উপস্থিত দর্শকেরা, আর সেই আনন্দধারা মিশে গিয়েছিল আর্তের প্রতি সহমর্মিতার এক মানবিক সুরে।