রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়া মামলার শুনানিতে আদালতে হট্টগোল ও হাতাহাতি
ছবি : বাংলা সংযোগ
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় শাহবাগ থানায় করা মামলায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতি আল নুর মোহাম্মদ আয়াস ও মারজিয়া খন্দকার রিমিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এ আদেশ দেওয়ার সময় আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান।
তিন দিনের রিমান্ড শেষে আজ বিকেলে আয়াস ও রিমিকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল গাফফার হিমেল আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, রিমান্ডে আসামিদের কাছ থেকে পলাতক অন্য আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং তাঁদের নাম–ঠিকানা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের কারাগারে রাখা একান্ত প্রয়োজন।
আদালত সূত্র জানায়, বেলা ৪টা ১০ মিনিটের দিকে পুলিশি পাহারায় আসামিদের ৯ তলার এজলাসে তোলা হয়। আসামিপক্ষে জামিন শুনানি করেন আইনজীবী মনির হোসেন সুমন। এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী মন্তব্য করেন, ‘এরা (আসামিপক্ষের আইনজীবী) সবাই জামায়াতের আইনজীবী। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।’
এই মন্তব্যের তীব্র আপত্তি জানান আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আল মহসিন তৌহিদ। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে আদালতে থাকা রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী তাঁর ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে ওই আইনজীবীকে মারধর করে তাঁর শার্ট টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং তাঁকে এজলাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ সময় এজলাসে হট্টগোল শুরু হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিয়াদ হাসান এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি আয়াস রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘স্যার, ক্ষমা চাই। আমি ক্ষমা চাই, প্লিজ।’ এ সময় তিনি নিজের আইনজীবীদেরও বলেন, ‘মারামারি করে আমার জীবন ধ্বংস করবেন।’
প্রায় আধা ঘণ্টা পর ৪টা ৪২ মিনিটের দিকে বিচারক রিয়াদ হাসান পুনরায় এজলাসে ওঠেন। তিনি উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিষয়টি খারাপ লাগল। আপনাদের কাছে এটা আশা করিনি। এ পর্যায়ে আমি আদেশ দিয়ে দিচ্ছি।’ এরপর তিনি আসামিদের জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদেশ শেষে পুলিশি পাহারায় আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে আসামি আয়াসকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কি মার্ডার (খুন) করে আসছি? আমাকে এভাবে নিচ্ছেন?’
এর আগে গত রোববার আয়াস ও রিমির তিন দিন এবং অপর দুই আসামি মো. সাকিবুল হাসান ও মো. সুজন মিয়ার দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। রিমান্ড শেষে গতকাল মঙ্গলবার সাকিব ও সুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
যে অভিযোগে মামলা
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঢাকার সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির ফটকের বিপরীতে গণপূর্তের সীমানাপ্রাচীরে সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিষয়ক বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। গত ৯ অক্টোবর আসামি আয়াস ওই গ্রাফিতি মুছে ফেলার ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী আসামিরা সেখানে জড়ো হন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় আয়াসকে বলতে শোনা যায়—‘আপনারা যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দাদা-দাদির কবর জিয়ারতে যান, যেটি পাকিস্তানে অবস্থিত, সেই ফাঁকে জিন্নাহর কবরটা দেখে আসতে পারেন। তাঁর নামফলক বাংলায় সুন্দরভাবে লেখা আছে। তিনি চাইতেন সরকারি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন ভাষা ব্যবহার হবে। তাই জিন্নাহকে বিনা কারণে গালাগালি করা রাজনৈতিক ছোটলোকি ও বাটপারি ছাড়া কিছু নয়।’
অন্যদিকে আসামি মারজিয়া খন্দকার রিমি বক্তব্য দেন, ‘আমরা এখানে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এসেছি। রবীন্দ্রনাথের জমিদারিতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার–নিপীড়ন চালানো হয়েছে। এই নিপীড়ক রবীন্দ্রনাথের ছবি বাংলাদেশের কোনো দেয়ালে দেখতে চাই না।’ এরপর তিনিই রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি মেখে দেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। ওই দিন ঘটনাস্থল থেকেই তাঁদের চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে পুলিশ বাদী হয়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এই মামলা করে।
