দৃষ্টিহীন চোখে কোরআন জয় চান সওদাগরের, জীবনসংগ্রামে হার
চার বছর বয়সে গুটিবসন্তে হারিয়েছেন দুই চোখের দৃষ্টি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাবাকে ধরে নিয়ে গুলি করে পাকিস্তানি বাহিনী। এরপর ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মারা যান মা। ছোটবেলাতেই এত সব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও দমে যাননি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চান সওদাগর (৫৬)। অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ব্রেইল পদ্ধতিতে মুখস্থ করেছেন পবিত্র কোরআন। কিন্তু জীবনের কঠিন সব পথ যিনি পেরিয়ে এসেছেন, আজ তিনি যেন হার মানছেন নিদারুণ অভাবের কাছে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে তাঁর দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে।
চান সওদাগরের বাড়ি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর হাতীভাঙ্গা ইউনিয়নের আমখাওয়া পূর্বপাড়া গ্রামে। স্ত্রী, সন্তানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যসংখ্যা পাঁচ। ২০২১ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে নিজের সামান্য সঞ্চয়টুকুও শেষ হয়ে যায় তাঁর। এরপর থেকেই পরিবারটিতে অভাব নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চান সওদাগরের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ট্র্যাজেডি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা মুনছর আলীকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। পরিবারের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উচ্চারণ করায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীনের তিন বছরের মাথায় দুর্ভিক্ষে মাকে হারিয়ে একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন দৃষ্টিহীন চান সওদাগর।
সেই ঘোর অন্ধকারের সময়ে এক বিদেশি নারী তাঁর পাশে দাঁড়ান। তিনি শিশু চান সওদাগরকে ঢাকার আসাদগেট এলাকার একটি বিশেষায়িত বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। সেখানে হাতের স্পর্শের (ব্রেইল পদ্ধতি) মাধ্যমে তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। কিন্তু ওই নারী নিজ দেশে ফিরে গেলে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে তাঁর জীবন। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। ঢাকার তেজগাঁও ইসলাম মিশনে ভর্তি হয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে পবিত্র কোরআন মুখস্থ (হিফজ) করেন। অর্জন করেন অন্যান্য শিক্ষাও। এরপর দীর্ঘ সময় মসজিদ ও মাদ্রাসায় ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন।
বয়সের ভার আর শারীরিক অসুস্থতায় চান সওদাগর এখন আর কাজ করতে পারেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এখন তাঁর ছেলে সিরাজুল ইসলাম। তিনি ভাড়ায় একটি ‘মিশুক’ চালান। সারা দিন গাড়ি চালিয়ে তাঁর আয় হয় মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সামান্য এই আয়ে পাঁচজনের আহার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আক্ষেপের সুরে দৃষ্টিহীন হাফেজ চান সওদাগর বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করে পড়াশোনা করেছি, কোরআনের হাফেজ হয়েছি। জীবনে কারও কাছে হাত পাতিনি। কিন্তু এখন পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। অভাবের কাছে আজ আমি বড় অসহায়।’
বাধ্য হয়েই এখন সমাজের বিত্তবান, দানশীল ব্যক্তি, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন এই জীবনসংগ্রামী মানুষটি। স্থানীয়দেরও প্রত্যাশা, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হাফেজ ও তাঁর অসহায় পরিবারের পাশে সহৃদয়বান মানুষেরা এগিয়ে এলে তাঁদের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।
সহযোগিতা পাঠানোর ঠিকানা:
হিসাবের নাম: শিরিনা বেগম
সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর: ৬৯৪৯
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, জামালপুর শাখা।
বিকাশ/নগদ: ০১৯২৬৬৮৫২৯৯ (ব্যক্তিগত)।