জ্বরে শরীর দুর্বল? দ্রুত সুস্থ হতে কী খাবেন, কী বাদ দেবেন
জ্বর এলেই শরীরের স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটে। দেখা দেয় চরম দুর্বলতা আর অরুচি। অনেকেই এ সময় শুধু ওষুধের ওপর ভরসা করেন, খাবারের প্রতি অনীহা দেখান। আবার কেউ কেউ দ্রুত শক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় ভারী খাবার, মিষ্টি বা নানা ধরনের পানীয় খেতে শুরু করেন।
কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। জ্বরের সময় শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ দিতে সঠিক খাবার ও পানীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই সময়ে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরে পর্যাপ্ত পানি, প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও শক্তি জোগানো। ক্ষুধা কম থাকলে একবারে বেশি না খেয়ে, অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
জ্বর হলে দ্রুত সুস্থ হতে খাদ্যতালিকায় কী রাখবেন আর কী বাদ দেবেন, চলুন জেনে নেওয়া যাক:
সবার আগে চাই পর্যাপ্ত পানি
জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে প্রচুর ঘাম হতে পারে। এর সঙ্গে যদি বমি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা থাকে, তবে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও লবণ দ্রুত বেরিয়ে যায়। এতে পানিশূন্যতার বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই জ্বর হলে নিয়মিত পানি পান করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। একসঙ্গে অনেক পানি পানে অস্বস্তি হলে অল্প অল্প করে বারবার পান করুন। তরলের চাহিদা মেটাতে পাতলা স্যুপ বা ডাবের পানিও দারুণ কার্যকর। বমি বা ডায়রিয়া থাকলে ওরস্যালাইন (ORS) পান করতে হবে।
স্বস্তি দেবে নরম ভাত-খিচুড়ি
জ্বরে মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় বলে অনেকেই খাবার খাওয়া একদম কমিয়ে দেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। এ সময় নরম ভাত, পাতলা খিচুড়ি, ডাল, সেদ্ধ আলু বা নরম করে রান্না করা সবজি হতে পারে সহজ সমাধান। এসব খাবার তুলনামূলকভাবে সহজে হজম হয় এবং শরীরকে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। তবে খাবারে অতিরিক্ত তেল, ঝাল বা মশলা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ভুলবেন না প্রোটিনের কথা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শরীরের ক্ষয় পূরণে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্বরের সময় কেবল ভাত বা খিচুড়ির ওপর নির্ভর না করে এর সঙ্গে ডিম, মাছ বা ডালের মতো প্রোটিনের উৎস রাখতে হবে। ক্ষুধা কম থাকলে বড় প্লেটে না খেয়ে ছোট বাটিতে অল্প ভাতের সঙ্গে এক টুকরো মাছ বা একটি ডিম খাওয়া যেতে পারে।
ফলের রস নয়, আস্ত ফল খান
জ্বরের সময় পেয়ারা, কমলা, কলা, আপেলসহ সহজে খাওয়া যায় এমন ফল বেছে নেওয়া বেশ উপকারী। তবে অনেকেই এ সময় বাজার থেকে কেনা ফলের রস খেয়ে থাকেন। পুষ্টিবিদদের মতে, ফলের রসের বদলে গোটা ফল খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। কারণ, ফলের রসে অনেক সময় বাড়তি চিনি থাকে এবং গোটা ফলের মতো উপকারী ফাইবার বা আঁশ এতে পাওয়া যায় না। তবে ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ফল নির্বাচন করা উচিত।
ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাবারকে ‘না’
জ্বরের সময় মুখের স্বাদ বদলে যাওয়ায় ঝাল, ভাজাপোড়া বা চটপটে খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এসব খাবার পেটের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার, কড়া মিষ্টি ও কোমল পানীয় পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই ভালো। জ্বর হয়েছে বলে জোর করে বেশি খাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শরীর যতটুকু নিতে পারে, ততটুকুই খাওয়া আরামদায়ক।
একনজরে জ্বরের সহজ ডায়েট
-
পানি ও তরল: নিয়মিত সাধারণ পানি, পাতলা স্যুপ, ডাবের পানি ও প্রয়োজন হলে ওরস্যালাইন।
-
মূল খাবার: নরম ভাত, পাতলা খিচুড়ি বা ওটস।
-
প্রোটিন: সেদ্ধ ডিম, হালকা ঝোলে রান্না করা মাছ, ডাল।
-
সবজি ও ফল: নরম করে রান্না করা সবজি এবং সহনীয় গোটা ফল (কলা, আপেল, কমলা)।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে?
মনে রাখতে হবে, জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়, এটি শরীরে বাসা বাঁধা অন্য কোনো রোগের উপসর্গ মাত্র। তাই জ্বরের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, পানিশূন্যতা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয় বা জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
(তথ্যসূত্র: এনএইচএস, মেডলাইন প্লাস ও মায়ো ক্লিনিক)