কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন মাঠে নামেন, পরিসংখ্যানবিদরা কলম আর ডায়েরি নিয়ে তৈরি থাকেন নতুন কোনো ইতিহাস লেখার জন্য। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ৮০ হাজার ৬৬৩ জন দর্শকের সাক্ষী হয়ে এমবাপ্পে কেবল গোলই করলেন না, ফুটবল ইতিহাসের রাজকীয় এক সিংহাসনে নিজের নাম খোদাই করে নিলেন। ব্রাজিলের দুই কিংবদন্তি লিওনিদাস ও রোনালদো নাজারিওকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলের অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়লেন ২৭ বছর বয়সী এই ফরাসি ফুটবল মহাতারকা।


তার এমন জাদুকরী রাতে সুইডেনকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স। আগামী ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়াতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ফরাসিদের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে।


ম্যাচের আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমবাপ্পের গোল ছিল ৮টি। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিটে চোখধাঁধানো এক ‘ক্রসওভার স্টেপে’ সুইডিশ ডিফেন্ডার ভিক্টর ইয়োকেরেসকে বোকা বানিয়ে যখন প্রথম গোলটি করলেন, তখনই ইতিহাসের পাতায় ওলটপালট শুরু হয়। কিংবদন্তি রোনালদোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর থামেননি তিনি। দ্বিতীয়ার্ধের ৭৪ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় ও নকআউট পর্বে ১০ম গোলটি করে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যান ফরাসি অধিনায়ক। ৮৫ মিনিটে যখন তাকে তুলে নেওয়া হয়, তখন গ্যালারির দর্শকদের পাশাপাশি ডাগআউটে কোচ দিদিয়ের দেশমও মাথা নত (বো) করে মাঠের রাজপুত্রকে অভিবাদন জানান।


রেকর্ড গড়ার রাতে গোল ছাড়িয়ে এমবাপ্পের উদযাপনটি হয়ে রইল ভীষণ আবেগের। মায়ের মৃত্যুর কারণে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন না কোচ দেশম। আজ তিনি ফিরতেই এমবাপ্পে যেন তাকে বিশেষ কিছু উপহার দিতে মুখিয়ে ছিলেন। প্রথমার্ধের গোলের পর সব বাঁধভাঙা উল্লাস ভুলে এমবাপ্পে সরাসরি ছুটে যান ডাগআউটে, জড়িয়ে ধরেন তার শোকাতুর প্রিয় গুরুকে। মুহূর্তটি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন সমর্থকরা।


চলতি বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচে এটি এমবাপ্পের তৃতীয় জোড়া গোলের প্রদর্শনী। আসরে তার মোট গোল এখন ৬টি, যা তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিয়ে গেছে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সমান্তরালে। একই সঙ্গে মাত্র ১৮টি ম্যাচ খেলে এমবাপ্পের মোট গোল সংখ্যা এখন ১৮। বিশ্বমঞ্চের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করা থেকে তিনি এখন মাত্র ১ ধাপ দূরে।


ম্যাচ শুরুর সময় নিউ জার্সির তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অসহ্য আর্দ্রতা আর অস্বাস্থ্যকর বাতাসের তোয়াক্কা না করে মাঠের ফুটবলে সুইডেনকে এক মুহূর্তের জন্যও থিতু হতে দেয়নি ফরাসিরা। পুরো ম্যাচে সুইডেনের মাত্র ৭টি শটের বিপরীতে ফ্রান্স শট নিয়েছে ২৫টি। প্রথমার্ধের পানি পানের বিরতিতে ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়েকে মাঠের স্প্রিংকলারের পানি দিয়ে শরীর ভিজিয়ে নিতে দেখা যায়, যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল পরিস্থিতি কতটা কঠিন ছিল।


ম্যাচে গোল না পেলেও ফ্রান্সের আক্রমণের আসল কারিগর বা ‘প্রাণভোমরা’ ছিলেন মাইকেল ওলিসে। তার অ্যাসিস্টের হ্যাটট্রিকেই সহজ হয় ফ্রান্সের জয়। ৩২ ও ৩৬ মিনিটে এমবাপ্পে ও ওলিসের শট পোস্টে লেগে ফিরে না এলে হারের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত সুইডেনের। ৫৩ মিনিটে ওলিসের পাস থেকেই ব্যবধান ২-০ করেছিলেন তরুণ তুর্কি ব্র্যাডলি বারকোলা। আর ৭৪ মিনিটে এমবাপ্পের ব্যাকহিল থেকে শুরু হওয়া আক্রমণে বারকোলা ও ওলিসের পা ঘুরে বল পান এমবাপ্পে, যা থেকে আসে দলের তৃতীয় গোল।
গ্রুপ পর্বের শতভাগ সাফল্যের পর নকআউটেও এমন দাপুটে পারফরম্যান্স জানিয়ে দিচ্ছে—শিরোপা ধরে রাখার মিশনে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স এখন উড়ছে।

ওকেআর / বাংলা সংযোগ