ফুটবল বিশ্বে এমন কোনো দল কি থাকতে পারে, যাদের বিপক্ষে আজ পর্যন্ত একবারও জয়ের মুখ দেখেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল? অবিশ্বাস্য শোনালেও এমন এক ‘অস্বস্তিকর’ প্রতিপক্ষ রয়েছে ফুটবলের রাজপুত্রদের। দলটির নাম নরওয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে সেলেসাওরা কখনোই হারাতে পারেনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এই দেশটিকে। আজ রাতে সেই চেনা ‘জুজু’র সামনেই আবার দাঁড়াতে হচ্ছে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে আজ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের বুকে যখন দুরুদুরু কাঁপন, তখনই এক টুকরো স্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে ‘জ্যোতিষী’ বিড়াল মিলু। তার পূর্বাভাস বলছে-আজই ভাঙবে নরওয়ে-বন্ধ্যত্ব, কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখবে ব্রাজিল।


কাগজে-কলমে কিংবা শক্তিমত্তায় ব্রাজিল যোজন যোজন এগিয়ে থাকলেও অতীত ইতিহাস নরওয়ের পক্ষে কথা বলে। দুই দল এ পর্যন্ত মোট ৪ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার একটিতেও জিততে পারেনি ব্রাজিল। ২টি ম্যাচ জিতেছে নরওয়ে, আর বাকি দুটি হয়েছে ড্র।


সবচেয়ে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক লড়াইটি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। বেবেতোর গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় তোরে আন্দ্রে ফ্লো এবং কিয়েতিল রেকদালের ৮৯ মিনিটের পেনাল্টি গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল নরওয়ে। এর আগে ১৯৯৭ সালের এক প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা। সর্বশেষ ২০০৬ সালের আগস্টে অসলোতে দুই দলের লড়াইটি ১-১ গোলে ড্র হয়। ফলে প্রায় দুই দশক পর যখন দুই দল আবার বিশ্বকাপের নকআউটে মুখোমুখি হচ্ছে, তখন ব্রাজিলের জন্য অতীতের এই পরিসংখ্যান মাথা ব্যথার বড় কারণ।


দুই দলের এই ঐতিহাসিক বৈরিতা এবং ব্রাজিলের জয়খরা নিয়ে যখন ভক্তদের মাঝে দুশ্চিন্তা তুঙ্গে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে ব্রাজিলের মিনাস গেরাইস রাজ্যের আগুয়ানিল শহরের এক কালো বিড়াল। নাম তার ‘মিলু’।


মালিক নাতান পিনহেইরোর পোষা এই বিড়ালটি চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতিটি ম্যাচের নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করে রাতারাতি তারকা বনে গেছে। এর আগে গ্রুপ পর্বে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র, এরপর হাইতি, স্কটল্যান্ড এবং শেষ বত্রিশের ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়ের সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিল সে। জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল পিছিয়ে পড়লেও মিলুর পূর্বাভাসের ওপর ভরসা রেখেছিলেন সমর্থকেরা, যা পরে সত্যি প্রমাণিত হয়।

মিলুর ভবিষ্যদ্বাণী করার পদ্ধতিটি বেশ অভিনব। নাতান পিনহেইরো দুটি একই রকম বাটিতে খাবার রাখেন এবং তার পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের পতাকা লাগিয়ে দেন। এরপর মিলুকে ছেড়ে দেওয়া হলে সে যে বাটি থেকে আগে খাবার খাওয়া শুরু করে, তাকেই বিজয়ী ধরা হয়। আজ রাতের ম্যাচের জন্য মিলু বেছে নিয়েছে ব্রাজিলের পতাকাবাহী বাটিটি। অর্থাৎ, তার গণনা অনুযায়ী আজ রাতে প্রথমবারের মতো নরওয়েকে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করবে সেলেসাওরা।


অবশ্য মিলুর ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে বিতর্কও কম নেই। অনেকেই অভিযোগ করেন, মালিক নাতান হয়তো মিলুকে নির্দিষ্ট বাটির দিকে প্ররোচিত করেন। তবে নাতান পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিও প্রকাশ করে কারসাজির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।


এদিকে গত ৪ জুলাই আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচে কেপ ভার্দের জয় দেখানোর মাধ্যমে মিলুর টানা শতভাগ সফলতার ধারায় প্রথম ছেদ পড়েছে (আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে ম্যাচটি জিতেছে)। তবে ব্রাজিলের সমর্থকেরা তাতে দমে যাননি। তাদের দাবি, অন্য দলের ম্যাচে ভুল করলেও নিজেদের দলের ক্ষেত্রে মিলু এখনো ‘ভুলহীন’।


কেবল বিড়াল মিলুই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সুপার কম্পিউটারের সিমুলেশনও ব্রাজিলের দিকেই হেলে আছে। পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অপটা’র সুপার কম্পিউটার ২৫ হাজারবার সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছে, ব্রাজিলের শেষ আটে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় ৬৫.৬ শতাংশ। অন্যদিকে নরওয়ের সম্ভাবনা ৩৪.৫ শতাংশ। এআই-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ব্রাজিল ২-১ গোলের ব্যবধানে ম্যাচটি জিততে পারে, যেখানে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নেইমারের পাশাপাশি নরওয়ের পক্ষে গোল করতে পারেন গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড।


শেষ পর্যন্ত কি ভিনিসিয়ুস-নেইমাররা মাঠের লড়াইয়ে নরওয়ে-জুজু কাটিয়ে মিলুর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করতে পারবেন? নাকি মার্টিন ওডেগার্ডের দল এবং আর্লিং হালান্ডের গোলক্ষুধা ব্রাজিলের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? উত্তর মিলবে আজ রাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসেই।