১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসার পর কেটে গেছে প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি। ৯৬ বছরের দীর্ঘ পথচলায় কত রোমাঞ্চ, কত রূপকথা আর কত নাটকীয়তার সাক্ষী হয়েছে বিশ্বফুটবল। কিন্তু যা আগে কখনো ঘটেনি, ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে ঘটল সেটাই। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার পরাশক্তিই জায়গা করে নিয়েছে সেমিফাইনালে।


কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ ম্যাচে আজ সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের এই জয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত হয়ে গেল শেষ চারের ঐতিহাসিক লাইনআপ।


সেমিফাইনালের টিকিট আগেই কেটে রেখেছিল ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ড। ফুটবলের বৈশ্বিক আসর মানেই যেখানে কোনো না কোনো আন্ডারডগের চমক কিংবা ফেবারিটদের বিদায়ের করুণ সুর, সেখানে এবার মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখল শীর্ষ চার দলই। লাইভ ফিফা র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ১ নম্বর দল ফ্রান্স খেলবে তিন নম্বর দল স্পেনের বিপক্ষে। আর র‍্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্জেন্টিনা লড়বে চার নম্বর দল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।


কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ সময় সকালে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচজুড়েই ছিল টানটান উত্তেজনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের চোখধাঁধানো এক গোল এবং অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেসের লক্ষ্যভেদে সেমিফাইনালের টিকিট পায় আর্জেন্টিনা। এর আগে ম্যাচের ১০ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার আর্জেন্টানাকে এগিয়ে নেওয়ার পর ৬৬ মিনিটে দান এনদয়ের গোলে সমতায় ফিরেছিল সুইজারল্যান্ড।


কানসাসের গ্যালারিভরা আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের উল্লাসে ভাসিয়ে ম্যাচের দশম মিনিটেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। অধিনায়ক লিওনেল মেসির নিখুঁত এক কর্নার কিক থেকে দারুণ হেডে লক্ষ্যভেদ করেন লিভারপুল মিডফিল্ডার ম্যাক অ্যালিস্টার। এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের অ্যাসিস্টের সংখ্যা ১০-এ নিয়ে গেলেন মেসি।


শুরুতেই এগিয়ে গিয়ে ম্যাচের লাগাম ধরে রাখার চেষ্টা করে আর্জেন্টিনা। তবে মাঝমাঠে গ্রানিত জাকার নেতৃত্বে রক্ষণ জমাট রেখে প্রতি-আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করে সুইসরা। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের লড়াই আরও জমে ওঠে। ৬৬ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়ে দারুণ এক নিচু শটে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন দান এনদয়। ম্যাচে ফেরে ১-১ সমতা।
সমতায় ফেরার কিছুক্ষণ পরই বড় ধাক্কা খায় সুইজারল্যান্ড। ৭১ মিনিটে ডাইভিং বা ‘সিমুলেশন’-এর দায়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়তে হয় সুইস স্ট্রাইকার ব্রিল এম্বোলোকেও। ১০ জনের সুইজারল্যান্ডকে পেয়ে আক্রমণে ধার বাড়ালেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলকে আর পরাস্ত করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।


ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত আধা ঘণ্টার লড়াইয়ে। সেখানে সুইস রক্ষণ ভাঙতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায় স্কালোনির দল। অবশেষে ১১২ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন হুলিয়ান আলভারেস। বক্সের কোনা থেকে দৃষ্টিনন্দন এক বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান তিনি। গোল খেয়ে সমতায় ফিরতে ১০ জনের সুইজারল্যান্ড যখন অলআউট আক্রমণে যায়, ঠিক তখনই প্রতি-আক্রমণ থেকে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে (১২০+১ মিনিটে) ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ৩-১ করেন লাউতারো মার্তিনেস।


এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজেদের টানা ১২ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রাখল আর্জেন্টিনা। ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অভিযানে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল তারা। আগামী বুধবার সেমিফাইনালে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ জুড বেলিংহামের ইংল্যান্ড।

এসকে / বাংলা সংযোগ