মিয়ামির মাঠে গোলবন্যা আর রেকর্ডের ছড়াছড়ি। কাতার বিশ্বকাপের রানার্সআপ ফ্রান্স ও থমাস টাচেলের ইংল্যান্ডের মধ্যকার লড়াইটি রূপ নিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য নাটকে। শেষ পর্যন্ত ১০ গোলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে শেষ হাসি হেসেছে থ্রি লায়ন্সরা। ইংল্যান্ডের হয়ে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচের নায়ক বনে গেছেন বুকায়ো সাকা। অন্যদিকে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন নিজের করে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।

দুই দলই এবারের আসরে ট্রফির বড় দাবিদার হিসেবে মাঠে নেমেছিল। তবে সেমিফাইনালের হতাশাজনক বিদায় তাদের শিরোপাস্বপ্ন ভেঙে দেয়। শেষ চারে ফ্রান্স স্পেনের কাছে এবং ইংল্যান্ড বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নিলে দুই পরাশক্তিকে মুখোমুখি হতে হয় সান্ত্বনার এই ম্যাচে।

মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে দুই কোচই নিজেদের মূল একাদশে বেশ কিছু চমক নিয়ে দল সাজিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড বস থমাস টাচেল দলের বড় দুই তারকা হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহামকে বেঞ্চে রেখে খেলা শুরু করেন। নিয়মিত গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের জায়গায় পোস্টের নিচে সুযোগ পান ডিন হেন্ডারসন। অন্যদিকে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশ্যম শুরুতেই বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন ওসমানে ডেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলাকে। ফরাসি ডাগআউটে এটিই ছিল দেশ্যমের শেষ ম্যাচ, যার মাধ্যমে দীর্ঘ ১৪ বছরের সম্পর্কের ইতি টানলেন তিনি।

ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজতে না বাজতেই আক্রমণের ঝড় তোলে ইংল্যান্ড। মাত্র তিন মিনিটের মাথায় আর্সেনাল মিডফিল্ডার ডিক্লান রাইসের এক দর্শনীয় দূরপাল্লার শটে এগিয়ে যায় ইংলিশরা। ফরাসি রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে ১৮ মিনিটে এজরি কোনসা ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া ফ্রান্স যখন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও মাইকেল ওলিসের পায়ে আক্রমণ শানাচ্ছিল, ঠিক তখনই গতিময় এক প্রতিআক্রমণ থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন বুকায়ো সাকা। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে সাকা নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলে ৪-০ ব্যবধানে বিরতিতে যায় থমাস টাচেলের দল।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ঘুরে দাঁড়াতে চারটি পরিবর্তন আনেন দেশ্যম। মাঠে নামানো হয় ওসমানে ডেম্বেলে, ডায়োট উপামেকানো, লুকা দিন এবং ব্র্যাডলি বারকোলাকে। কোচের এই চাল দ্রুতই কাজে দেয়। বিরতির পর কিলিয়ান এমবাপ্পে আসরে নিজের নবম গোলটি করে লিওনেল মেসিকে টপকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে চলে যান। এরপরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। দুর্দান্ত এক আক্রমণে ব্যবধান ৪-২ করেন বদলি হিসেবে নামা বারকোলা। গ্যালারিতে থাকা ফরাসি সমর্থকেরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন।

খেলার ৬৬ মিনিটে মাইকেল ওলিসের নিখুঁত পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপ্পে। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ২২-এ নিয়ে যান ফরাসি এই ফরোয়ার্ড, যা তাঁকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে বসিয়ে দেয়। একই সাথে চলতি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির চেয়ে দুই গোল এগিয়ে যান তিনি।

সমতায় ফেরার একাধিক সহজ সুযোগ নষ্ট করার খেসারত দিতে হয় ফ্রান্সকে। ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি বক্সে জেড স্পেন্সকে মালো গুস্তো ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। স্পটকিক থেকে বুকায়ো সাকা কোনো ভুল করেননি, বল জালে জড়িয়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার পাশাপাশি দলকে ৫-৩ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।

তবে ম্যাচের আসল নাটকীয়তা জমে ছিল শেষ মুহূর্তের জন্য। ইনজুরি টাইমের ষষ্ঠ মিনিটে (৯০+৬) ফ্রান্সের পক্ষে ব্যবধান ৫-৪ করেন ওসমানে ডেম্বেলে। তবে এর ঠিক দুই মিনিট পর একক নৈপুণ্যে ফরাসি রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে ইংল্যান্ডের পক্ষে ষষ্ঠ গোলটি করেন বদলি হিসেবে নামা জুড বেলিংহাম। এই গোলের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের এক আসরে ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৭টি গোল করার নতুন এক ইতিহাস গড়েন বেলিংহাম।

অবশেষে ৬-৪ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর বৈশ্বিক এই আসরে এটিই ইংল্যান্ডের সেরা অর্জন। তবে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের ক্ষত ইংল্যান্ড শিবিরের এই আনন্দ উৎসবের মাঝেও কিছুটা হলেও পোড়াবে সমর্থকদের।