বিজ্ঞাপন
বিশেষ প্রতিবেদন

অটোর দাপট, শৈশবের ফুটবল ও বিবর্ণ স্বদেশ

মির্জা আবদুর রাজ্জাক

আইনজীবী,বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
Published :
অটোর দাপট, শৈশবের ফুটবল ও বিবর্ণ স্বদেশ

আজ সকালে হাঁটতে যাওয়া হয়নি। শরীরটা কেমন ভালো লাগছিল না। ঘুম থেকে উঠতেও বেশ দেরি হয়েছিল। ভেবেছিলাম রাতে হাঁটবো।

সেভ করে, মুখ ধুয়ে নামাজ-দোয়া শেষ করে গোসল করতে যাব। হঠাৎ ডাক্তারের কথা মনে পড়ে গেল।

কিছুদিন আগে পল্টন থানার সামনে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করা কালে থানার দিক থেকে উল্টোপথে দ্রুত গতিতে একটি অটো এসে অনায়াসে আমার উপর ঝাপিয়ে পড়তে পড়তেই ঐ অটোর একমাত্র যাত্রী একজন তরুন চলতি অটো থেকেই লাফ দিয়ে নেমে আমাকে জাপটিয়ে ধরে এবং পেছনের দিকে সরানোর চেষ্টা করতে থাকে। এর মধ্যেই অটোটি আমাকে অতিক্রম করে মূল রাস্তা ধরে রং পথেই দ্রুত কেটে পড়ে। যাওয়ার সময় আমার ডান হাতের কব্জির নিচে বাহুতে এমনভাবে আঘাত করে যে, আমার বাহুর কয়েক স্থানে রক্ত ঝড়তে থাকে। ভাগ্যক্রমে আমার এলাকার চেনা জানা এক রিক্সাওয়ালাকে ওখানে দেখতে পাই। আমি দ্রুত তার রিক্সায় ওঠে বসি এবং ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল, মুগদায় চলে আসি। আমার ছোট ছেলে সুহৃদকে মোবাইলে ফোন করি। সেও চলে আসে। টিটেনাস দেই এবং কিছু ওষুধ নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। মনে মনে ভাবি, এর আগে সকালে হাঁটতে গিয়ে সবুজবাগে রাস্তা পাড় হওয়ার সময় বিদ্যুৎ বেগের অপ্রতিরোধ্য অটো দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কতদিন কত কষ্ট করলাম। এখন আবার দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাচ্ছি। অটো একটা বিধ্বংসী অবৈঙানিক যানবাহন। কোন স্প্রিং নেই। সরাসরি চাকার উপর বডি। আর যারা অটো চালায় তাদের কথা আর কি বলবো। স্পাইডারম্যান।
এমন একটা দেশ আমাদের, হাইকোর্ট নিষেধাঙা দেয়ার পরেও তা বাস্তবায়ন হয়না মুর্খতার দাপটে। তবে আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, অটো যদি এই কাঠামোতে চলা স্থায়ী হয়ে যায় তাহলে
অটোযাত্রীদের আল্লাহ'র বরাদ্দকৃত আয়ুর পারদ দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নামতে বাধ্য।

একমাসের অধিক সময় পার হয়ে গেল, ক্ষত এখনো কাঁচাই আছে। এক ডাক্তার শেস করে আর এক ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে এবং অবশেষে গতকাল বাংলা মটরের ডা. এম. এন হুদা সাহেবের চেম্বারে সিরিয়াল নেই।

করোনার সময় থেকে আমি সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে একবার, আর বাসায় ফেরার পর রাতে একবার, এই দু'বার গোসল করি এবং শাওয়ার জেল ব্যবহার করি।

ডাক্তার একবারের বেশি গোসল করতে নিষেধ করেন এবং তাঁর ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত শাওয়ার জেল দু'দিন পর পর ব্যবহার করতে বলেন।

ভেবে দেখলাম, সকালের চেয়ে রাতের গোসলটাই আমার জন্য জরুরি। গতকাল রাতে গোসল করেছি, এখন না করে বাইরের সব কাজ শেষ করে এসে রাতে গোসল করাটাই অধিক সমিচীন বলে আমার মনে হয়।

আবার মনে হয়, গরমের দিন, গোসল ছাড়া বাইরে গেলে শরীরে একটা অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেই, শাওয়ার জেল ছাড়া শুধু পানি গায়ে দিয়ে শরীরটা একটু ধুয়ে নিলে অতটা অস্বস্থি হয়তো লাগবে না।সিদ্ধান্তমতে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তথাকথিত গোসল সেরে ফেলি এবং দ্রুত প্রস্তুত হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাই।

পরিকল্পনা ছিল, প্রথমে বিজয়নগর চেম্বারে যাব এবং তারপর হাইকোর্টে।

বিজয়নগর গেলাম। অ্যাডভোকেট সোহেলের সাথে দেখা হলো। ফোনে ফোনে অনেকের সাথে কথা হলো। অ্যাডভোকেট মিনাল ভাইয়ের সাথে কথা হলো হাইকোর্টে আসবো বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না। বিজয়নগরেই সময় কেটে গেল আধা ঘুম ও অলস সময় পার করে।

স্টীল কেবিনেট খুলে কিছু একটা খুজতে খুজতে ডাকঘর নাটক সহ অন্যান্য বিষয়ে কিছু ছবি পেলাম। ডাকঘর নাটকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি যার ভেতরে আমার ছোট ছেলে সুহৃদ আছে, সেগুলো মোবাইলে ছবি তুলে সুহৃদের হুয়াটস এ্যপে পাঠিয়ে দেই। কিছুদিন আগে সুহৃদ বলেছিল ছবির কথা।

বিকেল চারটে বা তার একটু পরে বিদ্যুত চলে গেল। গরমও শুরু হলো। এভাবে আর থাকাটা ঠিক মনে হলো না।

ল্যাপটপটা গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম বাসার উদ্দেশ্যে।

স্কাউট মার্কেটের সামনে রাস্তা পার হয়ে ওপারে গিয়েই পরিচিত আরও একজন রিক্সাওয়ালা পেয়ে যাই। প্যাডেল রিক্সা। সব সময় মাথা গরম থাকে রিক্সাওয়ালা চাচার। পথে যেতে যেতে পাশ দিয়ে অতিক্রম করা বাহনকে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গালাগালি করতে থাকে। অনেক সময় ঝগড়াঝাটিও লেগে যায়।

ওর রিক্সায় উঠবোনা ভেবেছিলাম।কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওর অতিরিক্ত আগ্রহে বাধ্য হয়েই উঠতে হলো।

রাস্তা একরকম খালিই ছিল বলা য়ায়।
রিক্সায় উঠলে একদিকে যেমন দুনিয়ার ঘুম এসে ঘোর সৃষ্টি করে, অন্য দিকে নানান স্মৃতি এসে মগজে ভীড় করতে থাকে।
আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এমনি এক গভীর ঘোরে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি।

হঠাৎ বিকট শব্দে সম্বিত ফিরেগ পাই । বৌদ্ধ মন্দিরের ঢাল। তিন চারজন কিশোর অপর একটি অটোতে বসা। একজনের দু' আঙ্গুলের ফাকে একটি সিগারেট। দিয়েশলাই এখনো স্পর্শ করেনি। আমার মাথা গরম রিক্সাওয়ালা চাচা কিশোরদের কি যেন কঠিন এক গালি দিয়েছে, ওরা চাচাকে ছাড়বেনা। বিচার করবে, কঠোর বিচার। শেষে চাচা ভুল স্বীকার করে দু:খ প্রকাশ করায় ঘটনার নিষ্পত্তি হয়।

বাসার কাছাকাছি এসে মোচড় ঘুরতেই দেখি, দু'জন বালক ফুটবল খেলছে। জনমানবহীন কোলাহলমুক্ত একটি জায়গা। আমি কাছাকাছি পৌঁছুতেই কাকতালীয়ভাবে রিক্সার উপরে আমার পা বরাবর বল ছুটে আসে। আমি পা বাড়িয়ে দেই । পায়ে এমনভাবে বলটি লাগে ছেলে দু'টি আনন্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। একজন আরেকজনকে বলে, স্যার একদিন বালা খেলোয়ার আছিল। আমি তাদেরকে কাছে ডেকে দু'জনের হাতে দশ টাকা দশ টাকা করে বিশ টাকা দিয়ে বলি, তোমরাও অনেক ভালো খেল। অনেকক্ষণ খেলেছ নিশ্চয়ই। এখন এই বিশ টাকায় দু'টো চিপস কিনে চাবাতে চাবাতে বাসায় যাও। তোমাদের মা চিন্তা করবেন। ছেলে দুটি মাথা নিচু করে বলটি কুড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। আমি আস্তে করে ডাক দিলাম। দু'জনই ফিরে দাঁড়ালো। বললাম, আর একটু কাছে এসো। কাছে এলো। আমি বললাম, তোমাদের দু'জনকেই আমার খুব ভালো লেগেছে। পরিচয় যখন হলো খেলার মাঠে, তখন-
আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে একজন বললো, 'মাঠ কোথায় পেলেন স্যার, এটাতো রাস্তা।' আমি বললাম, রাস্তাকে মাঠ মনে করেই তো খেললে, এটাই মাঠ। আরও বললাম, তোমরা তো ভালো ছেলে। খেলাধুলায় মনযোগী ছেলেমেয়েরা খারাপ হয়না। তোমাদের সংঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। একজন বলে উঠলো, আমরা তো গরিব! আমি বললাম, সম্পর্ক আসলে গরিব আর ধনীর বিষয় নয়। সামাজিক বিষয়, আবার ধর্মীয়ও বলা যায়। যা হোক আবার দেখা হলে আরও কথা বলবো। আজ শুধু তোমাদেরকে একটা সালাম দিয়ে সম্পর্কটা শুরু করতে চাই। দু'জনেই একসাথে বলে উঠলো, সালাম তো ছোটরা বড়দেরকে দেয়। আপনি কেন দেবেন?
আমি উত্তরে বললাম, তোমরা তো দিলেনা।
আবারো দু'জনে একসাথেই বলে উঠলো, 'সরি স্যার, ভুল হয়েছে। বাবা মা বা স্কুল থেকে কখনো কিছু বলেনি তো। আজ আমরা আসি স্যার, আসসালামু আলাইকুম।' বলে একটা দৌড় দিয়ে চলে গেল।
আমি ভাড়া মিটিয়ে রিক্সা ছেড়ে দিলাম। পায়ে হেঁটেই এ টুকু যাব।

পায়ে পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি, আর মৌসুমি বায়ুর মত চারদিক থেকে নানা রকম ভাবনা এসে আমার মাথা ভারি থেকে আরও ভারি করে তুলতে থাকে । দেশ, দেশের মানুষ, মানুষের মন, সংস্কৃতি, এইসব শিশুদের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা, খেলাধুলা, সমাজ, ধর্ম আরো অনেক কিছু। আমরা একসময় এই শিশুদের মত ছোট ছিলাম। আমাদের জীবন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলার পরিবেশ, সুযোগ, সুবিধা ইত্যাদির সাথে আজকের জীবনের কোন মিল নেই । হবেও না হয়তো আর কোনদিনও।

হায়রে আমার সোনার বাংলা। এই কি ছিল তোমার ললাটের লিখন?
তুমি কি পারনা ঘুরে দাঁড়াতে?
কি করে দাড়াবে? তোমার অস্তিত্বই তো নড়বড়ে। সারা দিন রাত ভালোবাসার কথা বললেও খুব কম মানুষ তোমাকে ভালোবাসে। একটা শক্তিশালী শ্রেণী আছে তোমার অস্তিত্বই স্বীকার করেনা। কিন্ত তোমাকে যে কোন মূল্যে দখলে রাখতে চায়। সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক বলতে কিছু নেই। সোজা মেরুদন্ডের মানুষ একেবারেই অনুপস্থিত। সারা দেশ জুড়ে শুধু চাটুকারিতার চাষ, লুটেরা, পাচারকারী, ধর্ষণকারি ও সন্ত্রাসী তৈরির চাষ। শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা ও জীবন যাপনে নিজস্বতার নীতি আজ নির্বাসিত সযতনে। হাজার বছরের কৃষ্টি, ঐতিহ্য ভুলেও আজ আর কারো মনে দোলা দেয়না।

ভরসা তবে কোথায়? ভাবতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে পরিত্রাণের উপায়। নইলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষ তো দূরের কথা, বন্য জন্তুরাও আমাদেরকে নিয়ে সমাজে বসবাস করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করবে।