ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিদায় : জাতীয় সংসদে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণ
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদ। একজন প্রজ্ঞাবান সংসদীয় ব্যক্তিত্ব, সফল আইনজীবী, গণতন্ত্রে অবিচল আস্থাশীল রাজনীতিক ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে অভিহিত করেছেন সংসদ সদস্যেরা।
আজ রোববার (১২ জুলাই) ভোর সোয়া ৪টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর বিষয়টি সংসদকে অবহিত করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)। পরে তাঁর মৃত্যুতে সংসদে একটি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় এবং তার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে মরহুমের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
মোনাজাত পরিচালনা করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান। এরপর তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চলতি অধিবেশনের অন্যান্য সব কার্যসূচি স্থগিত রেখে সংসদ অধিবেশন মূলতবি করা হয়। পরে জাতীয় সংসদ ভবনের টানেলে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন ‘সেলফ-মেড ম্যান’। নিজের মেধা ও পরিশ্রমে সুদূর যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করে দেশের আইন ও রাজনীতিতে তিনি এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা উভয় স্থান থেকেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং জীবনে কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোসহীন। তিনি সব সময় বলতেন, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে পৌঁছানো যায় না। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জমির উদ্দিন সরকার রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে একজন সফল ও বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা যখন রাজনৈতিক ও আইনি হয়রানির শিকার হতেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন। আদালতে মামলা পরিচালনা করলেও তিনি কখনো পারিশ্রমিক নিতেন না এবং একে নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করতেন। স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করেছিলেন এবং আইন অঙ্গনে তিনি ছিলেন অনেকের শিক্ষক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক। তাঁর ব্যক্তিত্ব, শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ ছিল অনুকরণীয়। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। দলের প্রতি তিনি ছিলেন শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ। বয়সের কারণে নিজে নির্বাচন না করে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি নির্বাচন করলে নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী হতেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, প্রথা অনুযায়ী সাবেক স্পিকারদের যেভাবে জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়, জমির উদ্দিন সরকারকেও সেখানেই সমাহিত করা হবে। শারীরিকভাবে তিনি না থাকলেও সংসদেই চিরদিন থাকবেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্মৃতিচারণ করে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে দূর থেকে হ্যাট, কোট ও ছাতা হাতে কাউকে দেখলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পেশাদার।
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতি আজ একজন মহান রাজনীতিক, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং পরিচ্ছন্ন মনের মানুষকে হারিয়েছে। স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছিলেন।
সাবেক এই স্পিকারের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সংসদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
ওকেআর / বাংলা সংযোগ