বেতনহীনতা, ছাঁটাই আর নিরাপত্তাহীনতায় চরম শিখরে সংবাদকর্মীরা
‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর সাংবাদিক ছুঁলে ঘা গুনে শেষ করা যায় না’ - সমাজে এমন একটি প্রচলিত রসিকতা থাকলেও, বাস্তবে এই পেশার মানুষগুলোর পিঠেই এখন সবচেয়ে বেশি ঘা। বাইরে থেকে পেশাটিকে যতটা প্রভাবশালী ও চাকচিক্যময় মনে হয়, ভেতরের চিত্র ঠিক ততটাই অন্ধকার। পকেটে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আর ক্ষমতার দাপট সমাজের এমন বদ্ধমূল ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা আজ লড়ছেন টিকে থাকার এক অসম লড়াইয়ে।
বাসাভাড়া মেলে না, মেলে না সামাজিক স্বীকৃতিও
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সাংবাদিক পরিচয় দিলে অনেক সময় বাসা ভাড়া মিলতে চায় না। ‘নিয়মিত বেতন পান না, সময়মতো ভাড়া দেবেন কীভাবে’ বাড়িওয়ালাদের এমন আশঙ্কাই এর মূল কারণ। শুধু কি বাসা ভাড়া? অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের কারণে সংবাদকর্মীদের পাত্র-পাত্রী হিসেবেও অপছন্দ অনেকের। ‘আজ চাকরি আছে তো কাল নেই’ এমন খড়্গ মাথায় নিয়ে প্রতিদিন পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন হাজারো সংবাদকর্মী। এত বঞ্চনা, ঘৃণা আর করুণার পরও যে হাজারো তরুণ এই পেশায় আসছেন, তার একটাই কারণ তারা কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠস্বর হতে চান। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর আজ নিজেই রুদ্ধ।
লাশের সারি ও ভয়ংকর পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা যেন এখন পদে পদে মৃত্যুর ফাঁদ। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক নানাভাবে নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার এবং ১৭৪ জনকে জড়ানো হয়েছে হত্যা মামলায়। অন্যদিকে এইচআরএসএস-এর হিসাব বলছে, ২০ মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩৪ জন সাংবাদিক।
এই পরিসংখ্যানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির নাম। যিনি আত্মহত্যার আগে চিরকুটে লিখে গেছেন আর্থিক অনিশ্চয়তা আর শারীরিক কষ্টের কথা। বিভুরঞ্জন সরকার, সুহানা পারভীন তুলি, শবনম শারমীন বা রাহনুমাহ সারাহ তাঁদের প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ হয়তো আলাদা, কিন্তু নেপথ্যের কাঠামোগত অসুখটি অভিন্ন। অনুসন্ধান বলছে, বেতনহীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে এই মৃত্যুগুলোর সম্পর্ক কখনোই খতিয়ে দেখা হয়নি।
মালিকানার যাঁতাকলে ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের মালিকানা ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে। ফলে ক্ষমতার সমালোচনা করলে বা মালিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে মুহূর্তেই চাকরিচ্যুত হতে হয় সাংবাদিকদের। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া, নিয়োগপত্র না থাকা, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্র্যাচুইটির ব্যবস্থা না রাখা এসব এখন গণমাধ্যমগুলোর ‘অলিখিত নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। সামান্য বয়স বা বেতন বাড়লেই মফস্বল থেকে শুরু করে কেন্দ্রের সাংবাদিকদের যেকোনো অজুহাতে ছাঁটাই করা হচ্ছে। সংবাদকর্মীদের বাধ্য করা হচ্ছে বিজ্ঞাপন সংগ্রহে।
দলীয় বৃত্তে বন্দী পেশাজীবী সংগঠন
পেশাগত এই চরম সংকটে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময় বিবৃতি দিতে পারদর্শী হলেও কর্মীদের বকেয়া বেতন আদায়ে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে তাদের চরম অনীহা। এর অন্যতম কারণ সাংবাদিকদের মধ্যকার তীব্র দলীয় বিভক্তি। একপক্ষ যখন ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা নেয়, অন্যপক্ষ তখন নিপীড়নের শিকার হয়। সরকার বদলালে এই চক্রের কেবল হাতবদল ঘটে। কিন্তু সাধারণ সংবাদকর্মীদের অধিকার আদায়ে সম্মিলিত কোনো আওয়াজ ওঠে না।
রাষ্ট্রের নীরবতা ও সংস্কারের প্রহসন
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা বা হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রের নীরবতা পেশাটিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিস্থিতি উত্তরণে অন্তর্বর্তী আমলে কামাল আহমেদের নেতৃত্বে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠিত হয়েছিল। সেই কমিশনের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাবের কথা উঠে এলেও, সুপারিশগুলো ছিল মূলত শ্রম আইনেরই প্রতিধ্বনি। বাস্তবে তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র বা মালিকপক্ষের দৃশ্যমান কোনো আগ্রহ আজও চোখে পড়েনি।
সাংবাদিককে হয়তো প্রকাশ্যে অস্ত্র দিয়ে একবারই হত্যা করা যায়। কিন্তু বকেয়া বেতন আটকে রেখে, চাকরির ভয় দেখিয়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা দিয়ে একটি পেশাকে প্রতিদিন তিলে তিলে মারা হচ্ছে। লাশের সংখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এই গভীর সংকট পরিমাপ করা সম্ভব নয়; বরং কতজন বাধ্য হয়ে চুপ হয়ে গেছেন, কতজন পেশা ছেড়েছেন আর কতজন তরুণের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে—হিসাবটা এখন সেখানেই কষতে হবে।