বিজ্ঞাপন
জাতীয়

রোহিঙ্গা সংকটে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ চায় বাংলাদেশ, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

বাংলা সংযোগ ডেস্ক

Last Update :
Published :
রোহিঙ্গা সংকটে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ চায় বাংলাদেশ, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী

ছবি : সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেই দেশেই নিহিত রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মানবিক সহায়তা কোনোভাবেই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একই সঙ্গে, অনির্দিষ্টকাল এই সংকটের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

বুধবার সকালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে ‘রোহিঙ্গা সংকট’ নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

মানবিক সহায়তা নয়, স্থায়ী সমাধান চাই
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মানবিকতার তাগিদেই আমরা সীমান্ত খুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় শরণার্থী শিবির কোনো আদর্শ স্থান হতে পারে না। মানবিক সহায়তা দিয়ে অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনো সংঘাত ও অস্থিরতা চলছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেখানে চরম নিরাপত্তাহীনতা, জোরপূর্বক নিয়োগ ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।

পাঁচ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্বনেতাদের সামনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান:

১. বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ: রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. সহিংসতা বন্ধ: রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক মানুষের ওপর সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
৩. পর্যাপ্ত সহায়তা: রোহিঙ্গা ও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, যাতে স্থানীয়দের উন্নয়ন ব্যাহত না হয়।
৪. ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন বজায় রাখা এবং গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
৫. অপরাধ দমন: মাদক, মানবপাচার ও অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দীর্ঘায়িত এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে তরুণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাদক ও মানবপাচারের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি
মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় যে পরিমাণ অর্থ চাওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালে তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে। অথচ কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং নতুন প্রজন্মের রোহিঙ্গাদের বেড়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি বিবেচনায় সহায়তা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা চাই না রোহিঙ্গারা চিরদিন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। আমরা চাই তাদের নিজভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন ও বিতাড়নের আরেকটি গল্প না হয়, বরং তা যেন ন্যায়বিচার ও আশার গল্প হয়।’