জান্নাতে পুরুষদের জন্য ‘হুর’, নারীদের জন্য কী রয়েছে কোরআনে?
ছবি : বাংলা সংযোগ
পবিত্র কোরআনে জান্নাতের বর্ণনায় পুরুষদের জন্য ‘হুর’ বা রূপবতী নারী সঙ্গী দানের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি জানার পর অনেক মুসলিম নারীর মনেই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে - পুরুষেরা যদি জান্নাতে হুর পান, তবে নারীরা কী পাবেন? আল্লাহ তাআলা কি পুরুষদের বেশি নেয়ামত দিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও মানব মনস্তত্ত্বের চমৎকার কিছু দিক উন্মোচিত হয়।
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, কোরআনে পুরুষদের জন্য কেন বিশেষভাবে হুরের কথা বলা হয়েছে। পার্থিব জীবনে একজন পুরুষ প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রলোভনের মুখোমুখি হন। ইসলাম নর-নারীর অবাধ মেলামেশায় বিধিবিধান আরোপ করেছে এবং দৃষ্টি সংযত রাখার ওপর জোর দিয়েছে। যখন একজন যুবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে অনৈতিকতার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সংবরণ করেন, তখন তিনি এক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
দুনিয়ায় যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের তীব্র কামনা-বাসনা ও শারীরিক তাড়না নিয়ন্ত্রণ করেন, জান্নাতে তাঁকে সেই ত্যাগেরই এক পবিত্র ও চূড়ান্ত প্রতিদান দেওয়া হবে। আল্লাহ তাঁর অসীম ইনসাফের কারণেই জান্নাতে সেই দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেবেন, যা দুনিয়াতে বান্দা নিজের জন্য বন্ধ রেখেছিলেন।
নারীদের জন্য কি সমকক্ষ কোনো নেয়ামত নেই?
প্রশ্ন ওঠে, পুরুষদের জন্য এই প্রতিদানের কথা কোরআনে যতটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য সমকক্ষ সুদর্শন পুরুষ সঙ্গীর কথা সেভাবে কেন বলা হয়নি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে নারী ও পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতার মধ্যে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারী ও পুরুষের চাহিদার ধরন আলাদা। এই বিষয়টি বোঝাতে তরুণ-তরুণীদের ওপর চালানো একটি কাল্পনিক বা বাস্তব জরিপের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একবার সমসংখ্যক তরুণ ও তরুণীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—সব ধরনের বাধা বা জবাবদিহি ছাড়া যা খুশি চাওয়ার সুযোগ পেলে তাঁরা কী চাইবেন?
ছেলেদের উত্তর ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও একমুখী; তাদের বড় অংশেরই চাওয়া ছিল রূপবতী নারী সঙ্গী। কিন্তু মেয়েদের উত্তর ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। কেউ পরিবার বা মায়ের সঙ্গে থাকতে চেয়েছেন, কেউ নিজের পছন্দের প্রাণীর কথা বলেছেন, আবার কেউ বলেছেন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ, পুরুষের চাহিদা যেখানে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের চারপাশে ঘোরে, সেখানে নারীর আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের জগৎ অনেক বেশি বিস্তৃত ও বহুমুখী।
এ কারণেই নারীর কাছে কেবল ‘পুরুষ সঙ্গী’ ততটা আকর্ষণীয় নয়, যতটা আকর্ষণীয় হলো মানসিক প্রশান্তি, নিরাপত্তা, অলংকার, সুন্দর পোশাক, সাজগোজ এবং সন্তানসন্ততির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে জান্নাতের এমন অন্তত সাতটি নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন, যা নারী-পুরুষ সবাই লাভ করবেন এবং যা নারীদের কাছে বেশি আকাঙ্ক্ষিত।
কোরআনে বর্ণিত জান্নাতের অপরূপ নেয়ামত
সুরা ওয়াকিয়ার ১৫-২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘স্বর্ণ ও দামি পাথরখচিত আসনে হেলান দিয়ে তারা মুখোমুখি বসে থাকবে। তাদের আশপাশে ঘোরাফেরা করবে চিরকিশোররা, পানপাত্র ও প্রবহমান ঝরনার শরাবপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে... আর তারা ঘোরাফেরা করবে তাদের পছন্দমতো ফল ও পাখির গোশত নিয়ে।’
একই সুরার ২৫-৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা সেখানে কোনো বেহুদা বা পাপের কথা শুনবে না; শুধু শুনবে সালাম আর সালাম। তারা থাকবে কাঁটাবিহীন কুলগাছ ও কাঁদিপূর্ণ কলাগাছের নিচে, বিস্তৃত ছায়ায় ও সদা প্রবাহিত পানির পাশে।’
সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আনন্দ
নারীদের জন্য, বিশেষ করে মায়েদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড় উপহারগুলোর একটি হলো সন্তানদের ফিরে পাওয়া। সুরা তুরের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনে এবং তাদের সন্তানসন্ততি ইমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সঙ্গে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব।’
অর্থাৎ, কোনো সন্তানের নেক আমল যদি কমও হয়, কিন্তু সে ইমান নিয়ে মারা যায়, তবে আল্লাহ তাঁর নিজ রহমতে ওই সন্তানের মর্যাদা বাড়িয়ে জান্নাতে মা-বাবার কাছে পৌঁছে দেবেন। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কী হতে পারে!
যা চাইবেন, তা-ই পাবেন
সবশেষে, জান্নাতে গিয়ে কোনো মুমিন নারী বা পুরুষ সামান্যতম হতাশ বা বঞ্চিত হবেন না। সুরা হা-মিম সেজদার ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘জান্নাতে তোমাদের মন যা চাইবে এবং যা তোমরা দাবি করবে, তার সবই তোমাদের দেওয়া হবে।’
সুতরাং, জান্নাতে প্রবেশের পর মানুষের মনে যে আকাঙ্ক্ষাই তৈরি হোক না কেন, তা মুহূর্তেই পূরণ করা হবে। জান্নাতের সেই অনন্ত সুখের রাজ্যের দরজা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে উন্মুক্ত।