‘মারণাস্ত্র নয়, কূটনীতিই হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার’: জাতিসংঘে তারেক রহমান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সবার জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেড় দশকের শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে নতুন পথে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন) কৌশল গ্রহণ করেছে বলে তিনি জানান।
শুক্রবার জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।”
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ ও ‘থ্রি-আর’ কৌশল
ভাষণের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “দীর্ঘ আন্দোলন ও হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।”
গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো সংকট থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্র মেরামতের ‘থ্রি-আর’ কৌশল ব্যাখ্যা করেন। তারেক রহমান বলেন, এই কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানান, দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মমুখী ও নৈতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ব্যাগ, পোশাক ও দুপুরের খাবার প্রদানের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা ও ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’
জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছাতে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফারমার্স কার্ড’ ও ‘স্পোর্টস কার্ড’-এর সমন্বয়ে সরকার একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনার সুযোগ তৈরিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্বশান্তি
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহনকারী বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার চাপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এটি বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। বিশ্বশান্তি রক্ষায় শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণকে দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
স্মৃতিকাতর প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করেন তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে, যারা অতীতে এই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কথা বলেছিলেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’
ভাষণের শেষ পর্যায়ে এসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার নিয়ে বাঁচবে।”
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’— এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে শান্তি, গণতন্ত্র ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি তার ভাষণ শেষ করেন।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।