বিজ্ঞাপন
জাতীয়

‘গ্যাস আছে’, গ্যাস নেই : বাজারে এলপিজির দামে নৈরাজ্য

বাংলা সংযোগ ডেস্ক

Published :
‘গ্যাস আছে’, গ্যাস নেই : বাজারে এলপিজির দামে নৈরাজ্য

ছবি : সংগৃহীত

দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই - আমদানিকারক ও অপারেটরদের এমন আশ্বাসের পরও রাজধানীর বাজারে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আর যেখানে মিলছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর রামপুরা, বনশ্রী, শান্তিনগর, মালিবাগ ও কাঠালবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছেন।

রামপুরার বাসিন্দা সাথী আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সিলিন্ডার বাজারে আছে, কিন্তু দাম আকাশছোঁয়া। দোকানদার সাফ জানিয়ে দিচ্ছে—এই দামে নিলে নেন, না নিলে না নেন। আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামেই কিনছি।’

সরকারের দাম বনাম বাজারের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ সেপ্টেম্বর সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ বিইআরসির নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় ৯১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা। ডা. হামিদুর রহমান আজাদ নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সরকার বলছে সংকট নেই, তাহলে ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কেন? গ্যাস কার কাছে মজুত আছে, তা তদন্ত করে বের করতে হবে। এটি কোনো বিলাসপণ্য নয়, মানুষের নিত্যপ্রয়োজন।’

একদিকে ‘সংকট নেই’ দাবি, অন্যদিকে ঘাটতি
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে অপারেটররা দাবি করেছিলেন, দেশে গ্যাসের কোনো সংকট নেই। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সভায় মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন, কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। ১ অক্টোবর এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবও সরবরাহ ‘সন্তোষজনক’ বলে দাবি করে।

কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। কাঠালবাগানের এক খুচরা বিক্রেতা জানান, আগে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যেত, এখন অর্ধেকের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ পেতেও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য: প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়ার জটিলতা
বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে দাম নির্ধারণ করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তা ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে পৌঁছেছে। বাড়তি এই ব্যয় বহন করে লোকসান দিয়ে এলপিজি আমদানিতে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে আমদানিকারকদের।

টিএমএসএস-এলপিজির এজিএম আনিসুর রহমান বলেন, ‘যে প্রিমিয়ামের ভিত্তিতে বিইআরসি দাম ঠিক করেছে, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ব্যবসায়ীরা কত লোকসান দিয়ে পণ্য আনবে? আমরা রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছি।’

কী ঘটছে নেপথ্যে?
বাজারে একটি জোরালো গুঞ্জন রয়েছে, চলতি মাসের ঘোষণা আসার আগেই দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। দাম বাড়ানোর পরপরই বাজারে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ বাড়বে বলে ধারণা করছেন অনেকে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে একটি চক্র পণ্য মজুত করে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ ভোক্তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি তদারকির অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফালোভী মানসিকতাই সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগের মূল কারণ। এখন দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার না করলে নিত্যপণ্যের এই আকাশছোঁয়া দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।