প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নে কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাঁধের ভেতর দিয়ে লবণ পানি তোলার জন্য অবৈধভাবে বসানো পাইপগুলো অপসারণ না করেই চলছে সংস্কারের কাজ। এর মধ্যেই দুটি স্থানে বাঁধ ধসে নদীতে চলে গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে জোড়াতালি দিয়ে কাজ শেষ করলে আসন্ন বর্ষা ও দুর্যোগে বাঁধটি টিকবে না, যা আবারও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।

উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় প্রতিবছরই ভাঙনের কবলে পড়তে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। কয়রার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, টেকসই বাঁধ না হওয়ার পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়ম জড়িত।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া থেকে হোগলা অভিমুখে কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন ২৪০ মিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে। অনুন্নত রাজস্ব খাত (এনডিআর) প্রকল্পের আওতায় ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোং। গত ৯ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয়েছে এবং আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে তা শেষ করার কথা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধ সংস্কারে নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। বাঁধের ঢাল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত জিওব্যাগে বালুর পরিবর্তে কাদামাটি ও অপর্যাপ্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বাঁধের ভেতর দিয়ে যাওয়া পাইপগুলো। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিংড়ি ঘেরে সরাসরি কপোতাক্ষ নদ থেকে নোনা পানি তোলার জন্য বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে এসব পাইপ বসিয়েছেন। সংস্কারের সময়ও এই পাইপগুলো অপসারণ না করায় জোয়ার-ভাটার পানির চাপে পাইপের চারপাশ থেকে মাটি সরে গিয়ে বাঁধ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংস্কারাধীন প্রায় ১০০ মিটার জায়গার মধ্যেই অন্তত তিনটি এবং অপর অংশে একটি পাইপ রয়ে গেছে। এসব পাইপ অপসারণ না করেই চলছে মাটি ফেলার কাজ। পাইপসংলগ্ন এলাকায় এরই মধ্যে ফাটল ধরেছে এবং একটি অংশে বড় ধরনের ধস নেমে মাটি নদীতে চলে গেছে। সেখানে কোনোমতে জিওব্যাগ ও বাঁশের পাইলিং দিয়ে সাময়িক ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাঁধের একেবারে গা ঘেঁষে নদীর চর থেকে মাটি কেটে বাঁধের ওপরে ফেলা হয়েছে, যার ফলে নদীর পাড় আরও ভাঙনপ্রবণ হয়ে উঠছে। বাঁধের ঢালও করা হয়েছে অতিরিক্ত খাড়া।

মহারাজপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য দিদারুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই দুই কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি অবৈধ পাইপ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব পাইপ দিয়ে লবণ পানি তোলার কারণে বাঁধটি ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে। এই পাইপগুলো পুরোপুরি অপসারণ না করে কোটি টাকা খরচ করলেও বাঁধ টিকবে না। গত কয়েক বছরে পাউবোর ঢিলেঢালা কাজের কারণে এলাকাবাসীর জানমালের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।"

অবশ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পলাশ অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তাঁরা নিয়ম মেনেই কাজ করছেন। পাইপের কারণে যে অংশটি ধসে গেছে, তা ঠিকাদারের পক্ষ থেকে পুনরায় মেরামত করে দেওয়া হচ্ছে।

কয়রা উপ-বিভাগের পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী সোলাইমান হোসেন বলেন, "ধসে যাওয়া অংশ ঠিকাদারের মাধ্যমে মেরামত করানো হচ্ছে। আর যারা বেড়িবাঁধ কেটে অবৈধভাবে নোনা পানি তুলছেন, তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং দ্রুতই বাঁধের অবৈধ পাইপগুলো অপসারণ করা হবে।"

তবে পাউবোর কয়রা উপ-বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, "আমরা একাধিকবার অবৈধ পাইপ অপসারণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হয়েছে।"

এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, "উপকূলীয় এলাকার টেকসই উন্নয়নে সরকারি কাজ চলমান রয়েছে। সংস্কারাধীন বাঁধে ধস নামার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দ্রুতই বৈঠক করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"