ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের (এডিপি) প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মাসুদ রানা হরিপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. আব্দুস সালামের ‘ভাগিনা’ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কাজ শুরুর আগেই সব অর্থ তুলে নিয়েছেন।


এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এডিপির আওতায় হরিপুর উপজেলায় মোট ১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি প্রকল্পেরই সদস্যসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন বিএনপি নেতা মাসুদ রানা। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পগুলোর কোনো কাজ শুরু করার আগেই তিনি সভাপতিদের নামে ইস্যু করা চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা তুলে নিজের জিম্মায় নিয়েছেন।


সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর সভাপতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরাদ্দ বা প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। এমনকি এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) নিয়ম অনুযায়ী কোন প্রকল্পে কী ধরনের কাজ করা হবে, তাও তাদের জানানো হয়নি।


ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ও তিনটি প্রকল্পের সভাপতি মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে শুধু বলা হয়েছে যে আমি সভাপতি। কিন্তু প্রকল্পের সব টাকা মাসুদ রানার কাছে আছে। আমি এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমাকে বলা হয়েছে, গাছ লাগানো হবে আর হাসপাতালে সাপে কাটার ওষুধ (অ্যান্টিভেনম) দেওয়া হবে। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না। সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে আমাকে এতটুকুই বলতে বলা হয়েছে।’


একই ধরনের সুর শোনা গেল আমগাঁও ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও একটি প্রকল্পের সভাপতি আব্দুল করিমের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আমি মাসুদ ভাইয়ের হাতে দিয়েছি। তিনি বলেছেন কাজগুলো পরে করা হবে।’


বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. আব্দুস সালাম। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে লিখেছেন, হরিপুর উপজেলার প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কিছু পোস্ট তাঁর নজরে এসেছে।


এমপি আরও লেখেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই, আমার নাম ভাঙিয়ে বা পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকে, তবে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আমি ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। অনিয়ম প্রমাণিত হলে অপরাধীর পরিচয় যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


এদিকে এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসানও। ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় ঠাকুরগাঁও-২ আসনের জনগণ টের পাওয়া শুরু করেছেন, সামনে আরও পাবেন। কথা দিয়ে কথা রাখেননি, ফলাফল নিজের চোখেই দেখতে থাকুন।’


নেপথ্যে ‘মামা-ভাগনে সিন্ডিকেট’?
উপজেলায় এমন সরকারি অর্থ হরিলুটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপির একাংশও। হরিপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দীন অভিযোগ করে বলেন, ‘হরিপুরে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে হরিলুট চলছে। এখানে মূলত একটি মামা-ভাগনে সিন্ডিকেট সক্রিয়। উপজেলা প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিব এই অনিয়মের মূল হোতা। তাদের যোগসাজশেই সরকারি টাকা আত্মসাৎ করছেন মাসুদ রানা। এমপির নাম ব্যবহার করে এসব করায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে জানিয়েছি।’


অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হরিপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।


হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) চন্দন কর বলেন, ‘অনিয়মের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। খুব দ্রুতই প্রকল্পের স্থানগুলো পরিদর্শন করা হবে। প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখার পর যদি অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রেদওয়ান মিলন / বাংলা সংযোগ