আষাঢ়-শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। নদীবেষ্টিত এই জেলার নিম্নাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের প্রধান ভরসা এখন নৌকা। বর্ষার এই পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় জমে উঠেছে প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকার হাট। সপ্তাহের প্রতি বুধবার ঘিওর সদরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ও সংলগ্ন কলেজ মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই নৌকার জমজমাট বেচাকেনা। ছোট ছোট যানবাহনে করে সকাল থেকেই হাটে আনা হয় শত শত ডিঙি নৌকা। সঙ্গে থাকেন কাঠমিস্ত্রি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।


হাটে মেহগনি, কড়ই, আম, চাম্বল ও রেইনট্রি কাঠের তৈরি বাহারি ডিঙি নৌকার পসরা সাজিয়ে বসেন কারিগরেরা। আকার ও কাঠের মান অনুযায়ী একেকটি নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বর্তমানে হাটে ১০ হাত লম্বা ও আড়াই হাত প্রস্থের একটি ডিঙি নৌকা বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার টাকায়। ১১ হাত লম্বা ও ৩ হাত প্রস্থের নৌকার দামও হাঁকা হচ্ছে ৭ হাজার টাকা। একটু বড় আকারের ১৩ হাত লম্বা ও ৩ হাত প্রস্থের একটি নৌকা বিক্রি হচ্ছে ৮ হাজার টাকায়। আর ১৫ হাত লম্বা ও ৩ হাত প্রস্থের তুলনামূলক বড় নৌকাগুলোর দাম পড়ছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা।


পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার চাহিদার পাশাপাশি দামও বেশ বেড়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা থেকে নৌকা কিনতে আসা আলতাফ হোসেন বলেন, “কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে বাড়ির চারপাশ পানিতে ডুবে গেছে। এখন নৌকা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু হাটে এসে দেখছি নৌকার দাম বেশ চড়া। সাধারণ মানুষের জন্য এত টাকা দিয়ে নৌকা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

একই চিত্র দেখা গেল দৌলতপুরের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও। তিনি বলেন, “বাড়ির পাশেই নদী। গরু-ছাগলের দেখাশোনা করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা গৃহস্থালি কাজের জন্য নৌকা ছাড়া চলে না। বাধ্য হয়ে তাই ৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি ডিঙি নৌকা কিনতে হলো।”

শিবালয় থেকে আসা ক্রেতা জরিনা বেগমও একটি ডিঙি নৌকা কিনেছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, প্রতিটি নৌকার দাম আগের চেয়ে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

তবে নৌকার দাম বৃদ্ধির পেছনে কাঁচামাল ও কারিগরদের মজুরি বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন বিক্রেতারা। হাটের কাঠমিস্ত্রি ও ব্যবসায়ীদের দাবি—লোহা, কাঠ, আলকাতরাসহ সব ধরনের উপকরণের দাম এখন অনেক চড়া। সেই সঙ্গে বেড়েছে কারিগরদের দৈনিক মজুরিও। তাই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নৌকার দাম কিছুটা বাড়ানো ছাড়া তাঁদের আর কোনো উপায় ছিল না।


দিন দিন ঘিওরের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাটের পরিধি ও ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম বাড়ছে। মানিকগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে ক্রেতারা আসেন। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই হাটে এখনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টিউবওয়েল ও টয়লেটের মতো ন্যূনতম মৌলিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

হাটের ইজারাদার মো. মনির উদ্দিন বলেন, “প্রতি বছরই হাটে ডিঙি নৌকার সংখ্যা বাড়ছে। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় এখন মূল ঈদগাহ মাঠ ছাড়িয়ে পাশের কলেজ মাঠেও হাট বসাতে হচ্ছে। তবে হাটে ভালো মানের টয়লেট, খাবার পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংকট দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বুধবারের এই সাপ্তাহিক হাটে গড়ে ৯ থেকে ১০ লাখ টাকার নৌকা কেনাবেচা হয়। যাতায়াতের সংকট কাটাতে ও জীবিকার প্রয়োজনে এই হাটের নৌকাগুলোই হয়ে ওঠে পানিবন্দী হাজারো মানুষের পথ চলার একমাত্র সারথি।