ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কে ফাটল নরেন্দ্র মোদির
ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখার পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে শুরু করেছে ভারত। বাণিজ্য, সন্ত্রাসবাদ এবং পাকিস্তান—এই তিন মৌলিক ইস্যুতে নয়াদিল্লি এখন ওয়াশিংটনের প্রতি প্রকাশ্য অসন্তোষ জানাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত নীতির কারণেই ভারত এখন খোলামেলা সমালোচনার পথে হাঁটছে।
সন্ত্রাসবাদ ও পাকিস্তান প্রশ্নে অসন্তোষ
সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কণ্ঠে উঠে এসেছে ওয়াশিংটনের প্রতি তীব্র বিরক্তি। জয়শঙ্কর সরাসরি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের শিকার হওয়ার পরও ভারত যে উদ্বেগের মুখে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়।
বিশেষ করে পাকিস্তান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ঢিলেঢালা’ নীতি ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাতের পর ট্রাম্প যে মধ্যস্থতার দাবি করেছিলেন, তা নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের ‘তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, পাকিস্তানের নেতাদের ট্রাম্পের প্রশংসা এবং তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার বিষয়টিও ভারতের নীতি-নির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্লেষক হর্ষ পান্তের মতে, পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ বৃদ্ধি ভারতের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা ভাবনার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে।
বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে টানাপোড়েন
বাণিজ্যিক সম্পর্কেও এখন বড় ধরনের মেঘ জমেছে। ২০২৫ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য বাণিজ্য হলেও, দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়নি। বিশেষ করে কৃষি পণ্যের বাজার উন্মুক্ত করা নিয়ে দুই দেশ একমত হতে পারছে না।
এর ওপর যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইন। কোনো দেশ রাশিয়ার তেল কিনলে তাদের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রেখেছে ওয়াশিংটন। ভারতের ওপর যদি এই শুল্ক নীতি কার্যকর হয়, তবে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গভীর সংকটের মুখে ফেলবে বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া।
ভিসা নীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচিতে ভারতীয়দের প্রাধান্য থাকলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কড়াকড়ি অভিবাসন নীতি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। আগামী বছর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হতে যাওয়ায় মোদি সরকারের ওপর জনমতের চাপ বাড়ছে। অভিবাসন ও চাকরির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক প্রভাব ভোটারদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্পর্ক কি ফাটলের পথে?
তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখনই ভেঙে পড়বে—এমনটি মনে করার কারণ নেই বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথ খোলা রয়েছে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে সেই সংকটের সমাধান।
তবে ভূ-রাজনীতির এই নতুন মোড় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভারত এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রস্তুত নয়। নিজের জাতীয় স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে নয়াদিল্লি এখন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির পথে আরও বেশি দৃঢ় হচ্ছে।
লামিয়া তমা / বাংলা সংযোগ