বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান শিবিরের গলার কাঁটা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও ইরান যুদ্ধ

বাংলা সংযোগ ডেস্ক

Published :
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান শিবিরের গলার কাঁটা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও ইরান যুদ্ধ

ছবি : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি খুব একটা প্রভাব ফেলে না। ভোটারদের মূল মনোযোগ থাকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর। তবে এবারের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ও ব্যাপক শুল্কনীতির কারণে সাধারণ মার্কিনীদের জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। ফলে প্রেসিডেন্টের বৈশ্বিক পদক্ষেপগুলোই এখন ভোটারদের পকেটের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আগামী ৩ নভেম্বর দেশটিতে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে ভোটারদের এমন মনোভাব ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় এক মাথাব্যথার কারণ। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়েছে তারা।

চলতি মাসে রয়টার্স-ইপসোসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ মার্কিনী তাদের আয় কমে যাওয়া এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার জন্য ট্রাম্পের নীতিকেই দায়ী করছেন। ২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকানরা যেমন তুমুল জনপ্রিয়তাহীনতার মুখে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, এবারের পরিস্থিতি ঠিক তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, ‘মূল কথা হলো, সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের যুদ্ধ ও অন্যান্য নীতির নেতিবাচক প্রভাব এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তা নিয়ে ভোটারদের সামনে এখন তাদের অসন্তোষ প্রকাশের বড় সুযোগ এসেছে।’

জ্বালানি তেল ও মুদিপণ্যের বাড়তি দামে রীতিমতো পিষ্ট হচ্ছেন মার্কিনীরা। জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছানোয় ট্রাম্প নিজেও বুঝতে পারছেন যে ভোটাররা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সরাসরি যোগসূত্র খুঁজছেন।

জ্বালানির দাম কমানোর মরিয়া চেষ্টা হিসেবে সম্প্রতি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর এই পদক্ষেপ খোদ রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর পক্ষ নিচ্ছেন। এমনকি তিনি রুশ শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করতে কিয়েভকে চাপও দিয়েছেন।

যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হলো প্রায় আট মাস আগে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিন ভোটার এই যুদ্ধের বিরোধী। তবে ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ঠেকাতে মার্কিনীদের সাময়িকভাবে গ্যাসের এই বাড়তি দাম মেনে নেওয়া উচিত।

অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে তেলের দাম চড়া রাখার কৌশল নিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পকে বেকায়দায় ফেলা যায়। রয়টার্সকে এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ম্যাট মিডলটন ট্রাম্পের নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, ‘ইরান সংঘাতের কারণে বাজারে সাময়িক যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই স্পষ্টবাদী। তবে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক সাফল্য এবং ডেমোক্র্যাটদের ধ্বংসাত্মক বিকল্পের মধ্যকার পার্থক্যটা সবার কাছেই পরিষ্কার।’

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি কথা বেশ প্রচলিত - ‘ইট’স দ্য ইকোনমি, স্টুপিড’ (দিন শেষে অর্থনীতিই ভোটের মাঠের মূল নিয়ামক)। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সর্বশেষ জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পারিবারিক অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে। আর সিনেটেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে ভোট গণনা শেষে ট্রাম্প ঘরোয়া রাজনীতিতে কোণঠাসা বোধ করলে বিশ্বমঞ্চে কেমন আচরণ করবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যানের মতে, ‘যেসব প্রেসিডেন্ট দেশের ভেতরে রাজনৈতিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হন, তারা সাধারণত পররাষ্ট্রনীতির দিকেই বেশি মনোযোগ দেন; কারণ সেখানে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনের পর ট্রাম্প ইরান, রাশিয়া বা চীনের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরও বেপরোয়া হতে পারেন। অথবা এসবের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে তিনি হয়তো হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণের মতো নিজের ব্যক্তিগত আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়েই মেতে থাকবেন।

সূত্র- রয়টার্স