রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব: জেলেনস্কিকে সরানোর ডাক ট্রাম্পের
ছবি : বাংলা সংযোগ
রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তা–ই নয়, ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন কাউকে নেতৃত্বে আনারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে একটি চুক্তির ঘোষণার এক দিন পর গত শনিবার ট্রাম্প এ কথা বলেন। ট্রাম্পের এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।
হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে কড়া সমালোচনায় জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ডিজেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরই শনিবার ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া শহরে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে মস্কো। এই হামলায় ৩ শিশুসহ ২০ জন নিহত হয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ডিজেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি ইউক্রেনের জন্য নতুন একজন প্রেসিডেন্ট খোঁজার সময় এসেছে।’ তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা চালিয়ে জেলেনস্কি বিশ্বব্যাপী ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সে (জেলেনস্কি) আমাদের কৃষক ও খামারিদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চায়। কারণ, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা ডিজেলের বড় একটি অংশ আসে রাশিয়া থেকে।’
মস্কো আরও বেপরোয়া হবে: জেলেনস্কি
এর আগে গত শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ডিজেল চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। জেলেনস্কি বলেন, এই চুক্তি মস্কোকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরে সাড়ে চার বছরের এই যুদ্ধ বন্ধে মস্কোকে আলোচনায় বাধ্য করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। শনিবার রুশ সরকার জানায়, তারা ডিজেল রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা আংশিক প্রত্যাহার করেছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আজ রাশিয়া জাপোরিঝিয়ায় আবাসিক ভবনের ওপর পাঁচটি গ্লাইড বোমা ফেলে ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য (যুক্তরাষ্ট্রকে) ধন্যবাদ জানিয়েছে। গত রাতের হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, রাশিয়া মনে করে তাদের ওপর থেকে যেকোনো ধরনের চাপ কমানো মানেই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে এবং শহরগুলোতে নির্বিচারে বোমা ফেলতে পারে। এখন ভিন্ন বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।’
দক্ষিণ ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া শহরটি নিয়মিতই রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাসে সেখানে হামলার তীব্রতা বেড়েছে। শনিবার একটি আবাসিক ভবনের একাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলে এক ছয় বছর বয়সী শিশু নিহত হয়। উদ্ধারকর্মীরা যখন সাদা ব্যাগে ভরে তার মরদেহ বের করে আনছিলেন, তখন তার দাদা আনাতোলি চুমনিয় পাশে দাঁড়িয়ে ডুকরে কাঁদছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই মাসের শেষেই ওর জন্মদিন ছিল।’
চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনে এটি তৃতীয় বড় হামলা। বুধ ও বৃহস্পতিবার রুশ হামলায় প্রায় ৮০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ক্রামতোর্স্কে বোমায় ৩০ জন এবং কিয়েভ থেকে ১৩০ কিলোমিটার পূর্বে প্রিলুকি শহরে মিসাইল হামলায় ২২ জন নিহত হন।
মিত্রদের প্রতিক্রিয়া ও শান্তি আলোচনা
ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারাও। রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি ডন বেকন বলেছেন, সম্প্রতি কংগ্রেস যেসব নিষেধাজ্ঞা পাস করেছে, সেগুলো আরও কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করার সময় এসেছে, তুলে নেওয়ার নয়।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে জ্বালানির দাম খুব একটা কমার সম্ভাবনা নেই। কারণ, রাশিয়া সাধারণত যে পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি করে, বর্তমান চুক্তির আওতায় এর পরিমাণ অনেক কম।
এদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম শনিবার জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করবে ব্রিটেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই দুই নেতা সরাসরি বৈঠক করবেন বলেও জানানো হয়েছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা চলছিল। যুদ্ধ অবসানে একটি সাধারণ প্রস্তাবনা তৈরির লক্ষ্যেই এই আলোচনা হচ্ছিল বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু আলোচনা চলাকালেই ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন, যা কিয়েভকে অবাক করেছে। শনিবার ইউক্রেনের প্রতিনিধিদল দেশে ফিরে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স ইউক্রেন।
অন্যদিকে, শুক্রবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর পুতিন জানিয়েছেন, মস্কোয় ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। রুশ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার মস্কো সফর করতে পারেন।
হোয়াইট হাউসে দেওয়া বক্তব্যে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় জেলেনস্কির সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, যা ইচ্ছে করো, তবে শোধনাগারে হামলা কোরো না। আর সে ঠিক সেটাই করেছে। তার অবশ্যই এসব বন্ধ করা উচিত। আমি মনে করি তাদের নতুন একজন নেতা খুঁজে বের করা উচিত যিনি চুক্তি করতে পারেন। কারণ সে অনেক চুক্তি করতে পারত, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সে কখনো তা করে না।’
লামিয়া তমা / বাংলা সংযোগ