এআই কি মানবসভ্যতার জন্য হুমকি? গবেষকদের সতর্কবার্তা ও শঙ্কা
ছবি : সংগৃহীত
মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করার মন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। সেই প্রযুক্তি আজ এতটাই শক্তিশালী যে, খোদ এআই গবেষকরাই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের দুই গবেষকের সতর্কবার্তা নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাদের একজন তো সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকি ১০ শতাংশেরও বেশি!
ভয়ের কারণ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল ভয়ের জায়গাটি হলো ‘অ্যালাইনমেন্ট প্রবলেম’। ভবিষ্যতে এআই যখন মানুষের চেয়েও অধিক বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে উঠবে, তখন তার লক্ষ্য হয়তো আর মানুষের লক্ষ্যের সঙ্গে মিলবে না। যদি কোনো এআই তার কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে মানুষকে বাধা মনে করে, তবে সেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
মূলত দুটি ঝুঁকির কথা বারবার উঠে আসছে। প্রথমত, কোনো অপরাধী চক্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এআই ব্যবহার করে ভয়াবহ সাইবার হামলা বা জৈব অস্ত্র তৈরির মতো অপকর্ম ঘটাতে পারে। দ্বিতীয়ত, আরও গভীর মানুষ এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। যদি কোনো এআই নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করে নিজেই নিজের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে (রিঅকারসিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট), তবে তার ক্ষমতার বিস্তার মানুষের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
স্যাম অল্টম্যান ও ইভান হুবিঙ্গার কী বলছেন?
অ্যানথ্রপিকের গবেষক ইভান হুবিঙ্গারের মতে, বর্তমান মডেলগুলো থেকে ঝুঁকি কম মনে হলেও, প্রযুক্তি যে গতিতে এগোচ্ছে তাতে যেকোনো সময় আমরা বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারি। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও মনে করেন, বর্তমান এআই মডেলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং আমরা এক ধরনের ‘অজানা গন্তব্যের’ দিকে যাত্রা করছি।
এআই কি আসলেই পৃথিবী ধ্বংস করবে?
আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্টের ২০২৬ সালের মূল্যায়ন বলছে, বর্তমান চ্যাটজিপিটি, ক্লড কিংবা গ্রকের মতো এআই ব্যবস্থা এখনো পৃথিবী দখল করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি। কিন্তু এআই এজেন্টদের (AI Agent) স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা গবেষকদের চিন্তায় ফেলেছে। সম্প্রতি কিছু এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা সরাসরি পৃথিবী ধ্বংস না করলেও বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদও রয়েছে। এআই নিরাপত্তা গবেষক রোমান ইয়াম্পোলস্কি ধ্বংসের আশঙ্কাকে প্রবল মনে করলেও, মেটার এআই প্রধান ইয়ান লেকুনের মতে এই ঝুঁকি পারমাণবিক বিপর্যয়ের চেয়েও কম। অন্যদিকে, ইলন মাস্ক বা দারিও আমোদেইয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা ১০ থেকে ২৫ শতাংশ ঝুঁকির কথা বলছেন।
নিরাপত্তাই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন চলছে আরও শক্তিশালী মডেল তৈরির ইঁদুর দৌড়। অথচ এআইকে নিরাপদ রাখার প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো সেই গতির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না। গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো - মানুষ এআইকে যতটা শক্তিশালী করছে, সেটিকে নিরাপদ রাখার সক্ষমতা কি আমাদের আছে?
সবশেষে, এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করবে কি না - সেটি এখন সময়ের হাতে। তবে প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতার ফলাফলই হয়তো ঠিক করে দেবে, ভবিষ্যতের এআই মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হবে, নাকি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।