বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তি

কাগজের খাম থেকে ডিজিটাল

শিব্বীর বিন জিয়া

উপজেলা প্রতিনিধি, ইসলামপুর
Published :
কাগজের খাম থেকে ডিজিটাল

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বাড়ির উঠানে ছুটে আসতেন কেউ না কেউ। হাতে লেখা চিঠি এসেছে কি না, সেই অপেক্ষায় থাকতেন দূরের প্রিয়জনের খবরের আশায় থাকা মানুষ। খামের ওপর পরিচিত হাতের লেখা, ডাকটিকিটের গন্ধ আর চিঠির ভাঁজে জমে থাকা আবেগ–সব মিলিয়ে ডাকব্যবস্থা ছিল মানুষের যোগাযোগের এক অনন্য সেতু। সময় বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যমও।

মুঠোফোন, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর তাৎক্ষণিক বার্তার যুগে চিঠির সেই পুরোনো আবেদন অনেকটাই কমেছে। তবু ডাকব্যবস্থার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ভূমিকা খুঁজছে ডাক বিভাগ।

প্রতিবছর ৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ডাক দিবস। এই দিনটি শুধু ডাকব্যবস্থার ইতিহাস স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; মানুষের যোগাযোগ, বাণিজ্য, সামাজিক সংযোগ এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের অবদান নতুন করে মূল্যায়নেরও দিন।

বিশ্ব ডাক দিবসের সূচনা যেভাবে

বিশ্ব ডাক দিবসের ইতিহাস জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার উদ্যোগের সঙ্গে। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্নে স্বাক্ষরিত হয় বার্ন চুক্তি, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন। পরবর্তী সময়ে সংস্থাটির নাম হয় ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ)। ১৯৬৯ সালে জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউপিইউর কংগ্রেসে ৯ অক্টোবরকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। 

এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ডাকব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা। একই সঙ্গে ডাকসেবাকে আরও সহজলভ্য, কার্যকর ও আধুনিক করে তোলার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাও দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য: এক ডাক নেটওয়ার্ক, অসীম সম্ভাবনা

এ বছর বিশ্ব ডাক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘One Postal Network, Infinite Possibilities’–বাংলায় যার অর্থ, ‘এক ডাক নেটওয়ার্ক, অসীম সম্ভাবনা’। ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের মধ্যেও বিশ্বব্যাপী ডাক নেটওয়ার্ক কীভাবে মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিকে সংযুক্ত রাখতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিপাদ্যে। 

বর্তমানে ডাকব্যবস্থার কাজ কেবল চিঠি বা পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য সরবরাহ, আর্থিক লেনদেন, সরকারি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনীতির সংযোগ তৈরিতেও ডাক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট বা আধুনিক পরিবহনসেবা সহজলভ্য নয়, সেখানে ডাকঘর এখনো নির্ভরযোগ্য সেবাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ রাখে।

বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা: ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার পথে

বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ডাক বিভাগের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর দেশের যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং সরকারি-বেসরকারি চিঠিপত্র আদান-প্রদানে ডাক বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। গ্রাম থেকে শহর, উপজেলা থেকে জেলা–বিভিন্ন স্তরে ডাকঘরের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক মানুষের যোগাযোগের পথ সহজ করেছে।

একসময় চাকরির নিয়োগপত্র, পরীক্ষার ফলাফল, সরকারি নোটিশ, ব্যবসায়িক দলিল কিংবা স্বজনের খবর জানার প্রধান মাধ্যম ছিল ডাক। দূরে থাকা পরিবারের সদস্যের পাঠানো চিঠি অনেক বাড়িতে হয়ে উঠত আনন্দের উপলক্ষ। প্রবাসীর চিঠি কিংবা সেনানিবাস থেকে আসা খবরের অপেক্ষায় দিন গুনতেন স্বজনেরা। যোগাযোগের গতি ধীর হলেও সেই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা।

সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ডাক বিভাগের সেবার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ওয়েবসাইটে পার্সেল পাঠানো ও ট্র্যাকিং, ইলেকট্রনিক মানি অর্ডার, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড এবং অন্যান্য আর্থিক সেবার তথ্য রয়েছে। এসব সেবা প্রমাণ করে, আধুনিক চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ ডাক বিভাগের সামনে রয়েছে। 

চিঠির জায়গায় ই-মেইল, তবু ডাকঘরের প্রয়োজন ফুরায়নি

প্রযুক্তির উন্নয়নে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে চিঠির ব্যবহার অনেক কমেছে। এখন কয়েক সেকেন্ডেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যায়। ছবি, ভিডিও, নথি কিংবা জরুরি তথ্য আদান-প্রদানও সম্ভব হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। ফলে সাধারণ যোগাযোগের জন্য ডাকের ওপর নির্ভরতা আগের তুলনায় কমেছে।

তবে বাস্তব জগতে পণ্য ও নথি পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন রয়ে গেছে। অনলাইন কেনাকাটা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পণ্য বিক্রি, সরকারি নথি আদান-প্রদান এবং দূরবর্তী অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে ডাক ও পার্সেল নেটওয়ার্কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ডাক বিভাগের আধুনিক সেবার উদ্যোগেও পার্সেল সরবরাহ, অনলাইন ট্র্যাকিং ও ই-কমার্সকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।